বাংলা গানের ইতিহাসে কিছু কণ্ঠ শুধু গান গায় না, বরং সময়কে ধারণ করে। কিছু কণ্ঠ মানুষের আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, দেশপ্রেম আর অসংখ্য স্মৃতির সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে, সেই কণ্ঠকে আর শুধু একজন শিল্পীর কণ্ঠ বলে মনে হয় না; হয়ে ওঠে একটি যুগের পরিচয়। বাংলাদেশের সংগীতের ইতিহাসে তেমনই এক উজ্জ্বল নাম সাবিনা ইয়াসমীন। কয়েক দশকের দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি গেয়েছেন অসংখ্য চলচ্চিত্রের গান, আধুনিক গান, লোকগান, দেশাত্মবোধক গান, ধ্রুপদী ও উচ্চাঙ্গ সংগীতের নানা পরিবেশনা। তাঁর কণ্ঠে গাওয়া গান একসময় রেডিও, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের পর্দা পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। সময় বদলেছে, সংগীতের মাধ্যম বদলেছে, শ্রোতার রুচিতেও এসেছে পরিবর্তন, কিন্তু সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠের আবেদন আজও অমলিন। তাই তাঁকে শুধু একজন গুণী কণ্ঠশিল্পী বললে যেন তাঁর দীর্ঘ পথচলার পুরোটা বলা হয় না। তিনি বাংলা গানের এক জীবন্ত ইতিহাস।
১৯৫৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন সাবিনা ইয়াসমীন। তাঁর পারিবারিক নাম ছিল দিলশাদ ইয়াসমীন। তাঁর বাবা লুতফর রহমান ছিলেন ব্রিটিশ রাজের অধীনে সরকারি কর্মকর্তা এবং মা বেগম মৌলুদা খাতুন ছিলেন সংগীতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাঁদের পৈতৃক বাড়ি সাতক্ষীরা জেলার সদর উপজেলার বল্লী ইউনিয়নের মুকুন্দপুর গ্রামে। তবে বাবার চাকরির সূত্রে সাবিনা ইয়াসমীনের বেড়ে ওঠা নারায়ণগঞ্জে। ছোটবেলা থেকেই তিনি এমন একটি পরিবেশে বড় হয়েছেন, যেখানে গান ছিল প্রতিদিনের জীবনেরই অংশ। তাঁর বাবা রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন, তাঁর মা সংগীতের তালিম নিয়েছিলেন এবং পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যও সংগীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর বড় বোন ফরিদা ইয়াসমীন ও ফৌজিয়া ইয়াসমীন উচ্চাঙ্গ সংগীত শিখতেন। ছোট্ট সাবিনা তাঁদের পাশে বসে গান শুনতেন, শিখতেন এবং ধীরে ধীরে নিজেই গানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।
মায়ের কাছেই তাঁর গানের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু। হারমোনিয়াম বাজিয়ে শেখা তাঁর প্রথম গানগুলোর মধ্যে ছিল ‘খোকন মনি সোনা’। মায়ের কাছ থেকে তিনি আরও বিভিন্ন গান শিখেছেন। পরে তাঁর সংগীতজীবনে আসে নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদি তালিম। ওস্তাদ পি সি গোমেজের কাছে তিনি টানা প্রায় ১৩ বছর শাস্ত্রীয় সংগীতের শিক্ষা গ্রহণ করেন। ফলে তাঁর কণ্ঠের স্বাভাবিক মাধুর্যের সঙ্গে যুক্ত হয় সুর, তাল ও সংগীতের গভীর অনুশীলন। এই সাধনাই পরবর্তীকালে তাঁকে বহুমাত্রিক শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা রাখে।
মাত্র সাত বছর বয়সেই সাবিনা ইয়াসমীন প্রথম মঞ্চে গান করেন। তখন থেকেই তাঁর কণ্ঠ মানুষের নজর কাড়তে শুরু করে। পরে তিনি বেতারের শিশুদের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘খেলাঘর’-এ নিয়মিত গান গাইতেন। এই অনুষ্ঠানে তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে ছিলেন আরেক কিংবদন্তি শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ। শিশু বয়সেই সাবিনা ইয়াসমীন শ্রোতাদের সামনে গান গেয়ে পরিচিত হতে শুরু করেন। ‘খেলাঘর’ থেকে তাঁর প্রথম সম্মানী ছিল মাত্র ১০ টাকা। কিন্তু সেই সামান্য সম্মানীর মধ্যেই লুকিয়ে ছিল একটি দীর্ঘ সংগীতজীবনের প্রথম স্বীকৃতি।
সাবিনা ইয়াসমীন নামটির সঙ্গেও রয়েছে একটি সুন্দর গল্প। তাঁর নাম প্রথমে ছিল দিলশাদ ইয়াসমীন। একসময় ভারতের বিখ্যাত শিল্পী তালাত মাহমুদ ঢাকায় এসেছিলেন। তাঁর মেয়ে ছিলেন সাবিনা তালাত। সেই নামটি সাবিনার বড় বোন ফরিদা ইয়াসমীনের এতটাই পছন্দ হয়েছিল যে তিনি বাড়িতে এসে ছোট বোনের নাম বদলে দেওয়ার কথা বলেন। অনেক অনুরোধের পর শেষ পর্যন্ত দিলশাদের নাম রাখা হয় সাবিনা। আর সেই নামই পরবর্তীকালে কোটি মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে—সাবিনা ইয়াসমীন।
শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে তাঁর প্রথম গান আসে ১৯৬২ সালে ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে রবীন ঘোষের সুরে। তখনও তিনি ছোট্ট শিশু। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর সামনে খুলে যায় বাংলা চলচ্চিত্রের নেপথ্য সংগীতের বড় দরজা। ১৯৬৭ সালে ‘আগুন নিয়ে খেলা’ চলচ্চিত্রে আলতাফ মাহমুদের সুরে ‘মধুর জোছনা দীপালি’ গান গাওয়ার মাধ্যমে তিনি নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৩ বছর। এই গানটির জন্য তিনি ৫০০ টাকা সম্মানী পেয়েছিলেন। সেই বয়সে চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করা ছিল তাঁর জন্য যেমন বড় সুযোগ, তেমনি বাংলা চলচ্চিত্রের সংগীতজগতের জন্যও ছিল এক সম্ভাবনাময় কণ্ঠের আগমন।
এরপর একের পর এক চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠ শোনা যেতে থাকে। আলতাফ মাহমুদের সুরে ‘আনোয়ারা’, ‘নয়ন তারা’, ‘টাকা আনা পাই’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে গান করেন তিনি। কখনো একক গান, কখনো দ্বৈত গান, কখনো আবার কোরাস—বিভিন্নভাবে চলচ্চিত্রের সংগীতের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকেন। খান আতাউর রহমানের সুরে ‘মনের মত বউ’ চলচ্চিত্রে তাঁর গাওয়া ‘এ কী সোনার আলোয়’ গানটিও শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ষাটের দশকের সেই সময়টিতে তিনি ধীরে ধীরে নিজস্ব একটি পরিচয় তৈরি করছিলেন। কিন্তু তখনও সামনে অপেক্ষা করছিল আরও বড় সাফল্য।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সাবিনা ইয়াসমীনের সংগীতজীবন নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করে। ১৯৭২ সালে ‘অবুঝ মন’ চলচ্চিত্রের ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়’ গানটি তাঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। এরপর তাঁর কণ্ঠ যেন আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে। একই সময়ে ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’সহ বিভিন্ন গান শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়। ১৯৭৩ সালে ‘রংবাজ’ চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠে ‘সে যে কেন এলো না’ এবং ‘হই হই হই রঙ্গিলা’ গানগুলোও মানুষের মুখে মুখে ফিরতে থাকে। ‘অতিথি’ চলচ্চিত্রের ‘ও পাখি তোর যন্ত্রণা’ কিংবা ‘আলোর মিছিল’-এর ‘এই পৃথিবীর পরে কত ফুল ফোটে আর ঝরে’—এমন বহু গান তাঁর কণ্ঠকে আরও পরিচিত করে তোলে।
১৯৭৫ সালে আসে তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। ‘সুজন সখী’ চলচ্চিত্রে আব্দুল আলীমের সঙ্গে গাওয়া ‘সব সখীরে পার করিতে’ গানটির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ নারী নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এটি ছিল জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাঁর প্রথম বড় স্বীকৃতি। এরপর যেন পুরস্কার ও জনপ্রিয়তা তাঁর সংগীতজীবনের নিয়মিত সঙ্গী হয়ে ওঠে। ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’ এবং ‘কসাই’ চলচ্চিত্রের গানেও তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। তাঁর কণ্ঠ তখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংগীতের অন্যতম প্রধান শক্তি।
আশির দশকে সাবিনা ইয়াসমীনের জনপ্রিয়তা আরও ব্যাপক হয়ে ওঠে। ‘জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো’, ‘আমি রজনীগন্ধা ফুলের মত’, ‘চিঠি দিও প্রতিদিন’—এমন অনেক গান মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। ‘চন্দ্রনাথ’, ‘প্রেমিক’, ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’, ‘দুই জীবন’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রের গান তাঁর কণ্ঠে নতুন মাত্রা পায়। ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’ চলচ্চিত্রের ‘শত জনমের স্বপ্ন’ গানটির জন্যও তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সম্মানিত হন। আলাউদ্দিন আলীর সুরে ‘চিঠি দিও প্রতিদিন’ এবং ‘ও আমার রসিয়া বন্ধুরে’র মতো গান তাঁর জনপ্রিয়তার তালিকাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
তবে সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠের সবচেয়ে আবেগময় অধ্যায়গুলোর একটি হলো দেশাত্মবোধক গান। বাংলাদেশের মানুষের দেশপ্রেম ও জাতীয় আবেগের সঙ্গে তাঁর গাওয়া বেশ কিছু গান গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো’, ‘সব ক’টা জানালা খুলে দাও না’, ‘ও আমার বাংলা মা’, ‘মাঝি নাও ছাড়িয়া দে’, ‘সুন্দর সুবর্ণ’, ‘একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার’—এসব গান শুধু সংগীত হিসেবে নয়, মানুষের আবেগের অংশ হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছে। বিশেষ করে ‘সব ক’টা জানালা খুলে দাও না’ গানটি বাংলাদেশের শ্রোতাদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত ও প্রিয়। তাঁর কণ্ঠে দেশাত্মবোধক গানের যে আবেগ ফুটে উঠত, সেটিই তাঁকে অন্য অনেক শিল্পীর থেকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।
চলচ্চিত্রের গানেও তিনি কোনো একটি ধারার মধ্যে নিজেকে আটকে রাখেননি। প্রেম, বিরহ, আনন্দ, বেদনা, জীবনবোধ, সামাজিক বাস্তবতা কিংবা দেশপ্রেম—প্রতিটি আবেগ তিনি কণ্ঠে ধারণ করেছেন। আধুনিক গান, লোকগান, ধ্রুপদী, উচ্চাঙ্গ সংগীত কিংবা চলচ্চিত্রের গান—বিভিন্ন ধারায় তাঁর বিচরণ ছিল। তাঁর গায়কির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল শব্দের স্পষ্ট উচ্চারণ, সুরের প্রতি বিশ্বস্ততা এবং গানের আবেগকে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা। একটি গান শুধু গেয়ে যাওয়া নয়, গানের কথার অর্থ ও অনুভূতিকে নিজের কণ্ঠে জীবন্ত করে তোলাই ছিল তাঁর গায়কির বড় শক্তি।
বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়েও সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠ পৌঁছেছে বিভিন্ন দেশে। ইংল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে, হংকং, যুক্তরাষ্ট্র, বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশে তিনি গান পরিবেশন করেছেন। ভারত ও পাকিস্তানেও বহুবার সংগীত পরিবেশন করেছেন। ভারতীয় সংগীতজগতের বিখ্যাত সুরকার আর ডি বর্মণের সুরেও গান গেয়েছেন তিনি। কিশোর কুমার ও মান্না দের মতো কিংবদন্তি শিল্পীর সঙ্গেও দ্বৈত গান গাওয়ার সুযোগ হয়েছে তাঁর। শ্যামল মিত্র ও ভূপেন হাজারিকার সঙ্গেও তাঁর সংগীতজীবনে কাজের স্মৃতি রয়েছে। অর্থাৎ তাঁর সংগীতযাত্রা শুধু বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং উপমহাদেশের বৃহত্তর বাংলা ও ভারতীয় সংগীতজগতের সঙ্গেও তাঁর ছিল গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ।
সংগীতের পাশাপাশি সাবিনা ইয়াসমীন অভিনয়ও করেছেন। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ‘উল্কা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। ২০১০ সালে তিনি চ্যানেল আইয়ের ‘সেরা কণ্ঠ’ অনুষ্ঠানে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ দীর্ঘ সংগীতজীবনে শুধু গান গাওয়াই নয়, নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মূল্যায়ন ও সংগীতের সঙ্গে তাঁদের পথচলাতেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন।
সাবিনা ইয়াসমীনের দীর্ঘ সংগীতজীবনের স্বীকৃতিও এসেছে নানা দিক থেকে। চলচ্চিত্রের গানে অসংখ্যবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। বাচসাসসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। ১৯৮৪ সালে তিনি লাভ করেন একুশে পদক এবং ১৯৯৬ সালে অর্জন করেন স্বাধীনতা পুরস্কার। সংগীতে অবদানের জন্য দেশ-বিদেশে আরও বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন। ২০১৭ সালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড-দ্য ডেইলি স্টারের ‘জীবনের জয়গান’ উৎসবে আজীবন সম্মাননাও পেয়েছেন। তাঁর পুরস্কারের তালিকা দীর্ঘ, কিন্তু পুরস্কারের সংখ্যার বাইরেও তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মানুষের ভালোবাসা।
ব্যক্তিজীবনেও সাবিনা ইয়াসমীনের পথচলা ছিল নানা অভিজ্ঞতায় পূর্ণ। তিনি তিনবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। তাঁর প্রথম স্বামী ছিলেন আনিসুর রহমান এবং দ্বিতীয় স্বামী ছিলেন নৃত্য পরিচালক ও নৃত্য পরিকল্পক আমির হোসেন বাবু। পরবর্তীতে তিনি সংগীতশিল্পী ও সুরকার কবীর সুমনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর দুই সন্তান—কন্যা ফাইরুজ ইয়াসমীন এবং পুত্র শ্রাবণ।
তবে আলো আর সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর জীবনে এসেছে কঠিন সময়ও। ২০০৭ সালে তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং চিকিৎসার মধ্য দিয়ে কঠিন সময় পার করেন। পরে সুস্থ হয়ে আবারও সংগীতে ফিরে আসেন। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতেও তাঁর শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে বারবার সংগীত থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করেছে। ২০২৩ সালের শেষ দিকে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, মেলবোর্ন ও ব্রিসবেনে কয়েকটি স্টেজ শো করার পর তাঁকে দীর্ঘ সময় মঞ্চে দেখা যায়নি। ২০২৪ সালে আবারও তাঁর অসুস্থতার খবর আসে এবং চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরেও যেতে হয় তাঁকে।
দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় গান থেকে দূরে থাকার পর ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে আয়োজিত ‘আমাদের সাবিনা ইয়াসমীন : আমি আছি থাকব’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আবার মঞ্চে ওঠেন তিনি। দীর্ঘ সময় গান পরিবেশন করার পর সেদিন অসুস্থ হয়ে পড়লেও পরবর্তীতে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তাঁর জীবনের এই অধ্যায় যেন আরও একবার মনে করিয়ে দেয়—একজন শিল্পীর সঙ্গে তাঁর শিল্পের সম্পর্ক কতটা গভীর। শারীরিক বাধা, দীর্ঘ বিরতি কিংবা কঠিন সময়—কোনো কিছুই সংগীতের প্রতি তাঁর ভালোবাসাকে পুরোপুরি থামিয়ে রাখতে পারেনি।
সাবিনা ইয়াসমীনের সংগীতজীবনের ব্যাপ্তি বোঝার জন্য শুধু তাঁর পুরস্কারের তালিকা দেখলেই হবে না। বরং তাঁর গানগুলোর দিকে তাকাতে হবে। একদিকে যেমন আছে প্রেম ও বিরহের গান, অন্যদিকে আছে মানুষের জীবন ও অনুভূতির গান; আবার আছে দেশাত্মবোধক গান, যেগুলো বাংলাদেশের ইতিহাস ও আবেগের সঙ্গে মিশে গেছে। তাঁর কণ্ঠে গাওয়া অনেক গান একসময় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ ছিল। রেডিওতে বাজত, টেলিভিশনে প্রচারিত হতো, চলচ্চিত্রের পর্দায় শোনা যেত। পরে ক্যাসেট, সিডি পেরিয়ে সেই গানগুলো জায়গা করে নিয়েছে ইউটিউব ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও।
এটাই হয়তো একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় সাফল্য। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, শ্রোতাদের গান শোনার মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু শিল্পীর কণ্ঠ যদি মানুষের স্মৃতির মধ্যে বেঁচে থাকে, তাহলে সেই শিল্পী কখনো পুরোনো হন না। সাবিনা ইয়াসমীনও তেমনই একজন শিল্পী। তাঁর গান শুনে একটি প্রজন্ম যেমন নিজের যৌবনের স্মৃতি খুঁজে পায়, তেমনি নতুন প্রজন্মও তাঁর কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্য আবিষ্কার করে।
মাত্র সাত বছর বয়সে যে শিশুটি মঞ্চে দাঁড়িয়ে গান শুরু করেছিল, যে কিশোরী মাত্র ১৩ বছর বয়সে চলচ্চিত্রে নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল, সেই কণ্ঠই পরবর্তীতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংগীতের অন্যতম পরিচিত ও প্রভাবশালী কণ্ঠে পরিণত হয়। একের পর এক জনপ্রিয় গান, অসংখ্য চলচ্চিত্র, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার এবং মানুষের অগাধ ভালোবাসা—সব মিলিয়ে সাবিনা ইয়াসমীনের জীবন যেন বাংলা সংগীতের কয়েক দশকের একটি দীর্ঘ গল্প।
একজন শিল্পীকে কিংবদন্তি করে তোলে শুধু তাঁর প্রতিভা নয়; তাঁকে কিংবদন্তি করে তোলে সময়ের সঙ্গে টিকে থাকার ক্ষমতা, প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতার হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া এবং তাঁর সৃষ্টিকে মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পারা। সাবিনা ইয়াসমীন সেই বিরল শিল্পীদের একজন। তাঁর কণ্ঠে গাওয়া গান কখনো প্রেমের গল্প বলে, কখনো বিচ্ছেদের কথা বলে, কখনো মানুষের জীবনের কথা বলে, আবার কখনো বুকের ভেতর জাগিয়ে তোলে দেশপ্রেম।
তাই সাবিনা ইয়াসমীনের গল্প আসলে শুধু একজন গায়িকার গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের সংগীতের একটি দীর্ঘ সময়ের গল্প। এটি একজন শিশুশিল্পীর ধীরে ধীরে পরিণত শিল্পীতে পরিণত হওয়ার গল্প। এটি সাধনা, সাফল্য, জনপ্রিয়তা, সম্মাননা, কঠিন সময় এবং আবারও ফিরে আসার গল্প। আর সবকিছুর ওপরে এটি সেই কণ্ঠের গল্প, যে কণ্ঠ কয়েক দশক ধরে বাঙালির আবেগকে সুর দিয়েছে।
সাবিনা ইয়াসমীন—একটি নাম, একটি কণ্ঠ, একটি দীর্ঘ সংগীতযাত্রা। বাংলা গানের ইতিহাসে তাঁর অবদান হয়তো সময়ের সঙ্গে আরও নতুনভাবে আবিষ্কৃত হবে। কারণ কিছু কণ্ঠ কখনো হারিয়ে যায় না; তারা থেকে যায় মানুষের স্মৃতিতে, গানের কথায়, সুরের ভাঁজে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে থাকা ভালোবাসায়।
আরও খবর
প্লেব্যাক সম্রাট এন্ড্রু কিশোরের অজানা গল্প
বাংলা চলচ্চিত্রের গানের ইতিহাসে কিছু কণ্ঠ আছে, যেগুলো শুধু গান হয়ে মানুষের কানে পৌঁছায় না, বরং মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে...
‘দামাদাম গার্ল’ থেকে কিংবদন্তি রুনা লায়লা
উপমহাদেশের সংগীতজগতে এমন কিছু নাম আছে, যাদের পরিচয় কোনো একটি দেশ- কোনো একটি ভাষা কিংবা কোনো একটি সংগীতধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ...
আত্মজীবনী লিখলেন অঞ্জন দত্ত
সংগীতশিল্পী হিসেবে পরিচিত হলেও অঞ্জন দত্তের সৃজনশীল জগৎ বহুমাত্রিক। গান লেখা, সুর করা ও গাওয়ার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন সিনেমার সঙ্গে...
‘অঞ্জনা’ নিয়ে আসছেন মনির খান
দেশের শ্রোতাপ্রিয় সংগীতশিল্পী মনির খান। এই গায়কের ‘অঞ্জনা’ সিরিজের গানগুলো তার ভক্তদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়। প্রতি বছরই এ সংগীতশিল্পী জানুয়ারির...
আমি শান্তি চাই, একটু বাঁচতে সাহায্য করুন: তাহসান
গায়ক ও অভিনেতা তাহসান খান এবং তার স্ত্রী রোজাকে নিয়ে অনেক আলোচনা। বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই তাদের দাম্পত্য জীবনে ভাঙনের...
গুঞ্জন হচ্ছে সত্যি, বিয়ে করছেন জেফার-রাফসান
দীর্ঘদিনের গুঞ্জন ও কানাঘুষার অবসান ঘটিয়ে কাল বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন কণ্ঠশিল্পী জেফার রহমান ও উপস্থাপক রাফসান সাবাব। শোবিজ অঙ্গনে বহুল...
