বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নাম শুধু অভিনেতার পরিচয় বহন করে না—তারা নিজেরাই হয়ে ওঠেন একটি যুগের নাম।
যাদের পর্দায় উপস্থিতি মানেই দর্শকের মনে অন্যরকম এক উত্তেজনা, ভালোবাসা আর আবেগের জন্ম।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এমনই একজন কিংবদন্তি হলেন আব্দুর রাজ্জাক—যাকে কোটি দর্শক ভালোবেসে নাম দিয়েছিল নায়করাজ রাজ্জাক।

একজন অভিনেতা কীভাবে একটি দেশের চলচ্চিত্রের প্রধান নায়ক হয়ে উঠতে পারেন, কীভাবে কয়েক দশক ধরে নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেন, আর কীভাবে মৃত্যুর পরও মানুষের ভালোবাসায় বেঁচে থাকতে পারেন—রাজ্জাকের জীবন তারই এক অসাধারণ উদাহরণ।

আজকের গল্প সেই নায়করাজকে নিয়ে।
যার ক্যারিয়ারের শুরু হয়েছিল মঞ্চ নাটক দিয়ে, যিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করেছিলেন পথচলা, আর পরবর্তীতে যিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নায়ক।

কলকাতা থেকে শুরু

১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জে জন্ম নেন আব্দুর রাজ্জাক।

তার বাবা ছিলেন আকবর হোসেন এবং মা নিসারুননেছা। পরিবারটি ছিল স্বচ্ছল। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই রাজ্জাকের আগ্রহ ছিল অভিনয় আর সংস্কৃতির প্রতি।

স্কুলে পড়ার সময়ই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়।

সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় সরস্বতী পূজার একটি নাটকে অভিনয়ের জন্য শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাকে বেছে নেন। নাটকটির নাম ছিল ‘বিদ্রোহী’।

সেই ছোট্ট মঞ্চে দাঁড়ানো কিশোরটি তখন হয়তো জানতেন না—একদিন অভিনয়ই তার জীবনের পরিচয় হয়ে উঠবে।

ধীরে ধীরে মঞ্চ নাটকের প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে। অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে একসময় মুম্বাইয়েও যান তিনি।

কিন্তু ভাগ্য তখনও তার জন্য আরও বড় একটি গল্প লিখে রেখেছিল।

🇧🇩 ঢাকায় আগমন—শূন্য থেকে নতুন জীবন

১৯৬৪ সাল।

কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উত্তাল পরিস্থিতিতে এক রাতে রাজ্জাক পরিবার নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। পরদিন ২৬ এপ্রিল তিনি স্ত্রী লক্ষ্মী ও সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন।

সঙ্গে ছিল সামান্য কিছু জিনিসপত্র, কয়েকটি পরিচয়পত্র এবং চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন মানুষের ঠিকানা।

ঢাকায় এসে জীবন শুরু করা সহজ ছিল না।

স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে কমলাপুরে বাসা ভাড়া নেন। মাসিক ভাড়া ছিল মাত্র ৮০ টাকা।

আজ যাকে আমরা নায়করাজ নামে চিনি, সেই মানুষটিকেই তখন নিজের জায়গা তৈরি করতে একেবারে নতুন করে সংগ্রাম করতে হয়েছিল।

চলচ্চিত্রে কাজ পাওয়ার জন্য তিনি একের পর এক পরিচালকের সঙ্গে দেখা করতে থাকেন।

অবশেষে সুযোগ আসে।

১৯৬৪ সালে কামাল আহমেদের সঙ্গে ‘উজালা’ চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান রাজ্জাক। এরপর ‘পরওয়ানা’ চলচ্চিত্রেও সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন।

কিন্তু তার আসল স্বপ্ন ছিল ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো।

ছোট চরিত্র থেকে নায়ক

চলচ্চিত্রে তার প্রথম দিকের সময়টা ছিল সংগ্রামের।

‘১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’, ‘কার বউ’, ‘ডাক বাবু’, ‘আখেরী স্টেশন’সহ বেশ কিছু ছবিতে ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।

পাশাপাশি তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনে ‘ঘরোয়া’ ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করে দর্শকদের কাছে পরিচিতি পেতে শুরু করেন।

কিন্তু ১৯৬৬ সালেই আসে সেই সুযোগ, যা তার জীবন পুরোপুরি বদলে দেয়।

জহির রায়হানের পরিচালনায় নির্মিত ‘বেহুলা’।

এই ছবিতে সুচন্দার বিপরীতে লখিন্দর চরিত্রে অভিনয় করেন রাজ্জাক।

আর ‘বেহুলা’ শুধু একটি সিনেমা ছিল না—এটি ছিল রাজ্জাকের চলচ্চিত্র জীবনের টার্নিং পয়েন্ট।

তার অভিনয় দর্শকের নজর কাড়ে। বাংলা চলচ্চিত্র পেয়ে যায় নতুন এক নায়ককে।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

রাজ্জাক-কবরী—এক জুটির উত্থান

ষাটের দশকের শেষ দিকে বাংলা চলচ্চিত্রে যে জুটিটি দর্শকের হৃদয় দখল করে নেয়, তাদের অন্যতম ছিলেন রাজ্জাক ও কবরী।

১৯৬৮ সালে সুভাষ দত্তের ‘আবির্ভাব’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রাজ্জাক-কবরী জুটির যাত্রা শুরু হয়।

এরপর আসে ‘বাঁশরী’, আর ১৯৬৯ সালে নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘নীল আকাশের নিচে’।

‘নীল আকাশের নিচে’ ছবির মামুন চরিত্রে রাজ্জাক এবং তার বিপরীতে কবরী—দুজনের অভিনয় দর্শকের মনে এমনভাবে জায়গা করে নেয় যে রাজ্জাক-কবরী হয়ে ওঠে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি।

এরপর **‘ময়নামতি’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘দর্পচূর্ণ’, ‘দীপ নেভে নাই’**সহ একের পর এক চলচ্চিত্রে এই জুটিকে দেখা যায়।

তবে রাজ্জাকের অভিনয়জীবন শুধু রোমান্টিক নায়কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

‘জীবন থেকে নেয়া’—নায়ক থেকে প্রতিবাদী চরিত্র

১৯৭০ সালে জহির রায়হানের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’।

রাজনৈতিক-ব্যঙ্গধর্মী এই চলচ্চিত্রে রাজ্জাক অভিনয় করেন ফারুক চরিত্রে।

এখানে তিনি শুধু প্রেমের নায়ক নন। তিনি একজন সচেতন নাগরিক—যে নিজের চারপাশের অন্যায়, শোষণ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

রাজ্জাকের অভিনয় তখন প্রমাণ করে দেয়—তিনি শুধু রোমান্টিক নায়ক নন, প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি হয়ে উঠতে পারেন একজন প্রতিবাদী চরিত্রের শক্তিশালী অভিনেতাও।

আর ঠিক এই সময়েই বদলে যাচ্ছিল বাংলাদেশের ইতিহাস।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রও নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করে।

🇧🇩 স্বাধীন বাংলাদেশে রাজ্জাকের রাজত্ব

১৯৭২ সালে মুক্তি পায় রাজ্জাক অভিনীত ‘মানুষের মন’।

মোস্তফা মেহমুদের পরিচালনায় নির্মিত এই ছবির সাফল্যের মধ্য দিয়ে যেন শুরু হয় রাজ্জাক যুগ।

এরপর একের পর এক চলচ্চিত্র।

‘অবুঝ মন’, ‘ওরা ১১ জন’, ‘প্রিয়তমা’, ‘স্লোগান’—রাজ্জাক তখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রধান নায়ক।

শাবানার সঙ্গে তার জুটি বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

শাবানার বিপরীতে তিনি অভিনয় করেন প্রায় ৪০টি চলচ্চিত্রে।

এই জুটি দর্শককে উপহার দেয় প্রেম, পারিবারিক টানাপোড়েন, সামাজিক বাস্তবতা আর আবেগে ভরা অসংখ্য গল্প।

অন্যদিকে ববিতার সঙ্গেও রাজ্জাকের জুটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়।

‘পীচ ঢালা পথ’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘স্বরলিপি’, ‘প্রিয়তমা’—বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তাদের অভিনয় দর্শকের মনে আলাদা জায়গা তৈরি করে।

রাজ্জাক তখন শুধু একজন তারকা নন।

তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় পুরুষ তারকাদের একজন।

পুরস্কারের ঝুলিতে একের পর এক স্বীকৃতি

রাজ্জাকের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি বাড়তে থাকে তার অভিনয় দক্ষতার স্বীকৃতিও।

১৯৭৬ সালে ‘কি যে করি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি প্রথমবারের মতো শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

এরপর ১৯৭৮ সালে ‘অশিক্ষিত’ চলচ্চিত্রের রহমত চরিত্রে অভিনয়ের জন্য পান আরেকটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

গ্রামের একজন অশিক্ষিত পাহারাদারের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দেখিয়ে দেন—একজন বড় তারকা চাইলে সাধারণ মানুষের চরিত্রেও কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেন।

এরপর ‘বড় ভাল লোক ছিল’ চলচ্চিত্রের জন্য ১৯৮২ সালে আবারও শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

১৯৮৪ সালে ‘চন্দ্রনাথ’ ছবির জন্য পান আরেকটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

আর ১৯৮৮ সালেও শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তিনি।

অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে মোট পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

এমন অর্জন তাকে শুধু জনপ্রিয় নায়ক নয়, একজন স্বীকৃত অভিনয়শিল্পী হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করে।

নায়ক থেকে পরিচালক

রাজ্জাক শুধু ক্যামেরার সামনে থাকতে চাননি।

তিনি ক্যামেরার পেছনেও নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিতে শুরু করেন।

১৯৭৭ সালে ‘অনন্ত প্রেম’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

এরপর একে একে পরিচালনা করেন ‘বদনাম’, ‘অভিযান’, ‘জিনের বাদশা’, ‘প্রফেসর’, ‘বাবা কেন চাকর’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’ সহ আরও বেশ কিছু চলচ্চিত্র।

তার পরিচালিত চলচ্চিত্রের মধ্যে বিশেষভাবে আলোচিত ‘বাবা কেন চাকর’।

এই ছবিতে তিনি নিজেই বাবার চরিত্রে অভিনয় করেন।

পরবর্তীতে ছবিটি কলকাতায়ও পুনর্নির্মিত হয় এবং সেখানেও সাফল্য পায়।

অর্থাৎ রাজ্জাকের প্রভাব শুধু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না—তার অভিনয় ও চলচ্চিত্রের গল্প পৌঁছে গিয়েছিল দুই বাংলার দর্শকের কাছেও।

কেন তিনি ‘নায়করাজ’?

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—রাজ্জাককে কেন বলা হয়েছিল ‘নায়করাজ’?

এই উপাধি তাকে দিয়েছিলেন চলচ্চিত্র পত্রিকা ‘চিত্রালী’র সম্পাদক আহমদ জামান চৌধুরী।

আর এই নামটি যেন রাজ্জাকের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে গিয়েছিল।

কারণ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তার যে প্রভাব ছিল, সেটি ছিল সত্যিই রাজকীয়।

একসময় সিনেমা মানেই রাজ্জাক।

তার নাম থাকলেই দর্শক হলে যেত।

তার সঙ্গে কবরী, সুচন্দা, ববিতা, শাবানাসহ বিভিন্ন নায়িকার জুটি ছিল দর্শকের কাছে আলাদা আকর্ষণ।

কিন্তু তার জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল—তিনি সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলাতে পেরেছিলেন।

যুবক প্রেমিক থেকে তিনি হয়েছেন প্রতিবাদী যুবক।

গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে শহুরে চরিত্র।

বাবা, বিচারক, পুলিশ, শিক্ষক কিংবা সমাজের নানা শ্রেণির মানুষের চরিত্রেও তাকে দেখা গেছে।

স্বাধীনতা পুরস্কার ও আজীবন সম্মাননা

দীর্ঘ অভিনয়জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে রাজ্জাককে দেওয়া হয় আজীবন সম্মাননা।

২০১৫ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় পুরস্কারগুলোর একটি স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন তিনি সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য।

এর আগেও তিনি বাচসাস পুরস্কার, মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন।

১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির প্রথম সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

তার মানে, তিনি শুধু চলচ্চিত্রের পর্দার নায়ক ছিলেন না—চলচ্চিত্রের মানুষের অধিকার ও সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

ব্যক্তিজীবনে রাজ্জাক

পর্দায় লাখো মানুষের প্রিয় নায়ক হলেও ব্যক্তিজীবনে রাজ্জাক ছিলেন পরিবারকেন্দ্রিক একজন মানুষ।

১৯৬২ সালে তিনি বিয়ে করেন লক্ষ্মীকে।

তাদের সংসারে জন্ম নেয় সন্তানরা। বড় ছেলে বাপ্পারাজ, ছোট ছেলে সম্রাটসহ তার সন্তানরাও পরবর্তীতে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হন।

অর্থাৎ রাজ্জাকের পরিবারও একসময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেরই একটি পরিচিত পরিবারে পরিণত হয়।

নিজের সন্তানদের নিয়ে কাজ করেছেন তিনি।
পরিচালনা করেছেন। অভিনয় করেছেন।

এভাবেই তার চলচ্চিত্রের উত্তরাধিকারও ছড়িয়ে পড়ে পরবর্তী প্রজন্মে।

শেষ অধ্যায়

দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয় করেছেন রাজ্জাক।

শত শত চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। পরিচালনা করেছেন বহু চলচ্চিত্র।

কিন্তু কিংবদন্তির জীবনও একদিন থেমে যায়।

২০১৭ সালের ২১ আগস্ট।

সন্ধ্যা ৬টা ১৩ মিনিটে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নায়করাজ রাজ্জাক।

তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।

২৩ আগস্ট বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

সেদিন শুধু একজন অভিনেতার মৃত্যু হয়নি।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একটি যুগের অবসান ঘটেছিল।

নায়করাজ কি সত্যিই চলে গেছেন?

না।

কারণ কিংবদন্তিরা আসলে কখনো পুরোপুরি চলে যান না।

তারা থেকে যান তাদের অভিনীত চরিত্রে।

থেকে যান সিনেমার গানে।

থেকে যান সংলাপে।

থেকে যান দর্শকের স্মৃতিতে।

আজও যখন ‘বেহুলা’র কথা আসে, রাজ্জাকের মুখ মনে পড়ে।

‘নীল আকাশের নিচে’ বললে মনে পড়ে রাজ্জাক-কবরীর সেই সময়।

‘জীবন থেকে নেয়া’ মনে করিয়ে দেয় তার প্রতিবাদী চরিত্রকে।

‘অশিক্ষিত’ মনে করিয়ে দেয় তার অভিনয়ের গভীরতা।

‘বড় ভাল লোক ছিল’ মনে করিয়ে দেয় তার অভিনয় দক্ষতা।

আর ‘বাবা কেন চাকর’ মনে করিয়ে দেয় একজন অভিনেতার পাশাপাশি একজন পরিচালক রাজ্জাককেও।

সমাপ্তি

একজন মানুষ কলকাতার টালিগঞ্জ থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন।

মঞ্চে অভিনয় করেছিলেন।

স্বপ্ন নিয়ে মুম্বাই গিয়েছিলেন।

তারপর ইতিহাসের এক কঠিন সময়ে পরিবার নিয়ে চলে এসেছিলেন ঢাকায়।

মাত্র ৮০ টাকা মাসিক ভাড়ার একটি বাসা থেকে শুরু হয়েছিল নতুন জীবন।

ছোট চরিত্র থেকে ধীরে ধীরে তিনি উঠে এসেছিলেন চলচ্চিত্রের শীর্ষে।

তারপর?

বেহুলার লখিন্দর থেকে বাংলাদেশের নায়করাজ।

অভিনেতা থেকে পরিচালক।

তারকা থেকে প্রতিষ্ঠান।

আর একজন মানুষ থেকে একটি যুগের প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন আব্দুর রাজ্জাক।

তিনি ছিলেন এমন একজন নায়ক, যার সিনেমা দেখতে মানুষ হলে যেত শুধু গল্প দেখার জন্য নয়—রাজ্জাককে দেখার জন্য।

তার পর্দায় আসা ছিল একসময় দর্শকের কাছে উৎসবের মতো।

আর তাই ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট তার শারীরিক বিদায় হলেও বাংলা চলচ্চিত্র থেকে নায়করাজের বিদায় হয়নি।

কারণ—

কিছু নায়ক পর্দা থেকে হারিয়ে যান।
কিছু নায়ক সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়ে যান।
আর কিছু নায়ক—সময় পেরিয়ে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন।

আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন সেই কিংবদন্তি।

তিনি ছিলেন—নায়করাজ।

বাংলা চলচ্চিত্রের নায়করাজ রাজ্জাক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post মৌসুমী | নব্বইয়ের দশকের স্বপ্নের নায়িকা (ভিডিও)
Close

ঢাকাই সিনেমার রাজা | নায়করাজ রাজ্জাক | প্রেম, সংগ্রাম, সাফল্য আর কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গল্প

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নাম শুধু অভিনেতার পরিচয় বহন করে না—তারা নিজেরাই হয়ে ওঠেন একটি যুগের নাম। যাদের পর্দায় উপস্থিতি মানেই দর্শকের মনে অন্যরকম এক...

মৌসুমী | নব্বইয়ের দশকের স্বপ্নের নায়িকা (ভিডিও)

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এমন কিছু নায়িকা আছেন, যাদের নাম উচ্চারণ করলেই ভেসে ওঠে একটি সোনালি সময়ের স্মৃতি। সেই তালিকার একেবারে প্রথম সারিতেই রয়েছেন মৌসুমী। একজন...

সালমান শাহ | অমর মহানায়কের অজানা গল্প (ভিডিও)

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু যাদের জনপ্রিয়তা কখনও শেষ হয়নি। সেই নামগুলোর একেবারে শীর্ষে রয়েছেন সালমান শাহ। [embed]https://www.youtube.com/watch?v=h_-pulbsd44[/embed] মাত্র...

মা হচ্ছেন প্রিয়াঙ্কা

টিভি নাটকের অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা জামান। গেল বছর নভেম্বরে ভালোবেসে নারায়ণগঞ্জের ছেলে রাকিবুল হাসানকে বিয়ে করেন এই অভিনেত্রী। বর পেশায় টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। পারিবারিকভাবেই তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানিকতা...

যৌনপল্লি উচ্ছেদের গল্পে ‘রঙবাজার’

রাশিদ পলাশ পরিচালিত নতুন সিনেমা ‘রঙবাজার’–এর ট্রেইলার প্রকাশ পেয়েছে। শনিবার (১১ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় প্রযোজনা সংস্থা লাইভ টেকনোলজিসের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজে ট্রেইলারটি প্রকাশ করা হয়। নির্মাতা...