ফারুক মাহফুজ আনাম। এই নামটি হয়তো অনেকের কাছেই খুব পরিচিত নয়। কিন্তু তিনি যখন গিটার হাতে মঞ্চে দাঁড়ান, তখন তার পরিচয়ের জন্য আর কোনো নামের প্রয়োজন হয় না। কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের সংগীতপ্রেমীদের কাছে তিনি পরিচিত একটি মাত্র নামে—জেমস। আর ভক্তদের কাছে তিনি ‘গুরু’। লম্বা চুল, চোখে সানগ্লাস, হাতে গিটার, আর গলার সেই গভীর, কর্কশ অথচ অদ্ভুত আবেগময় স্বর—সব মিলিয়ে জেমস শুধু একজন গায়ক হয়ে থাকেননি, তিনি বাংলা রকসংগীতের একটি আলাদা পরিচয়ে পরিণত হয়েছেন। তার গান শুনে বেড়ে উঠেছে একাধিক প্রজন্ম। তার কণ্ঠে প্রেম যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে অভিমান, একাকিত্ব, বিদ্রোহ, শহুরে জীবনের অস্থিরতা আর মানুষের বেঁচে থাকার গল্প। কিন্তু আজকের এই জেমস হয়ে ওঠার পথটা মোটেও সহজ ছিল না। এর শুরু হয়েছিল নওগাঁয় জন্ম নেওয়া এক দুরন্ত ছেলেকে দিয়ে, যার স্বপ্ন ছিল অন্যরকম।
১৯৬৪ সালের ২ অক্টোবর নওগাঁয় জন্মগ্রহণ করেন ফারুক মাহফুজ আনাম। তার বাবা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা এবং কর্মসূত্রে পরিবারের বসবাস ও তার পড়াশোনা হয়েছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়। তবে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম। ছোটবেলা থেকেই জেমস ছিলেন ভীষণ দুরন্ত ও বহির্মুখী স্বভাবের। নদীতে সাঁতার কাটা ছিল তার প্রিয় কাজ। বন্ধুদের সঙ্গে সাঁতার কাটতে গিয়ে কখনো কখনো মাঝনদী পর্যন্ত চলে যেতেন। এই দুরন্ত ছেলেটির ভেতরেই ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল এমন একটি মন, যে সহজে কোনো বাঁধন মানতে চাইত না। পড়াশোনার পাশাপাশি তার আগ্রহ বাড়তে থাকে সংগীতের দিকে। গিটার, গান আর মঞ্চ যেন ধীরে ধীরে তার কাছে জীবনের অন্য সবকিছুকে ছাপিয়ে যেতে শুরু করে।
কিন্তু সংগীতকে পেশা হিসেবে নেওয়ার বিষয়টি পরিবার সহজভাবে নেয়নি। কারণ পরিবারের প্রত্যাশা ছিল, ছেলে প্রচলিত পথে এগিয়ে যাবে, একটি স্থির জীবন বেছে নেবে। অথচ জেমসের মনে তখন অন্য স্বপ্ন। গান তার কাছে নিছক শখ ছিল না, বরং নিজের অস্তিত্ব প্রকাশের একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। পরিবারের সঙ্গে মতবিরোধের একপর্যায়ে কিশোর বয়সেই তিনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিংয়ে শুরু হয় তার জীবনের নতুন অধ্যায়। সেই সময়ের আজিজ বোর্ডিংয়ের ছোট্ট একটি ঘরই হয়ে ওঠে তার আশ্রয়। খুব বেশি কিছু ছিল না সেখানে—একটি ছোট ঘর, প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস আর তার সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী গিটার। কিন্তু সেই ঘরেই আড্ডা, গান আর স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে তৈরি হতে থাকে একজন শিল্পীর নিজস্ব জগৎ।
আজিজ বোর্ডিংয়ের সেই সময়টিই জেমসের সংগীতজীবনের ভিত শক্ত করে দেয়। বন্ধুদের নিয়ে গড়ে ওঠে ফিলিংস নামের ব্যান্ড। জেমস সেখানে কণ্ঠশিল্পী ও গিটারিস্ট হিসেবে নিজের জায়গা তৈরি করেন। তখন বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের পরিসর আজকের মতো বড় ছিল না। রকসংগীতও ছিল অনেকের কাছে নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা। কিন্তু জেমসের কণ্ঠ ও গিটার খুব দ্রুতই আলাদা করে নজর কাড়তে শুরু করে। তার গানের মধ্যে ছিল এমন একটি তীব্রতা, যা প্রচলিত মিষ্টি গায়কির সঙ্গে মিলত না। তার কণ্ঠে যেন জীবনের খসখসে বাস্তবতা ছিল। গিটার বাজানোর ধরনেও ছিল নিজস্বতা। ধীরে ধীরে ফিলিংস চট্টগ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে পরিচিত হতে থাকে এবং জেমসের নামও ছড়িয়ে পড়ে দেশের ব্যান্ডসংগীতের ভক্তদের মধ্যে।
ফিলিংসের প্রথম অ্যালবাম ‘স্টেশন রোড’ প্রকাশের পর সেই পরিচিতি আরও বিস্তৃত হয়। আশির দশকের শেষভাগে বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীত যখন নিজের ভাষা তৈরি করার চেষ্টা করছে, তখন জেমসও নিজের ভাষা খুঁজে নিচ্ছিলেন। তবে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধু একটি ব্যান্ডের গায়ক হয়ে থাকা ছিল না। নিজের ভেতরের আরও ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলো প্রকাশ করার জন্য তিনি এককভাবেও কাজ শুরু করেন। প্রকাশিত হয় ‘অনন্যা’। এই অ্যালবাম জেমসের ক্যারিয়ারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। শ্রোতারা বুঝতে পারেন, ব্যান্ডের শক্তিশালী রক সাউন্ডের বাইরে একক শিল্পী হিসেবেও জেমসের একটি স্বতন্ত্র জগৎ রয়েছে। এরপর ‘পালাবে কোথায়’, ‘দুঃখিনী দুঃখ করোনা’, ‘ঠিক আছে বন্ধু’, ‘আমি তোমাদেরই লোক’, ‘জনতা এক্সপ্রেস’, ‘তুফান’ ও ‘কাল যমুনা’র মতো কাজের মাধ্যমে তার একক ক্যারিয়ার আরও বিস্তৃত হতে থাকে।
এই সময়টাতেই জেমসের গান শুধু গান হিসেবে নয়, একটি প্রজন্মের অনুভূতির ভাষা হিসেবে জায়গা করে নিতে শুরু করে। তার কণ্ঠে এমন কিছু ছিল, যার সঙ্গে শহরের তরুণেরা নিজেদের জীবনকে মিলিয়ে নিতে পারত। প্রেমের ব্যর্থতা, একাকিত্ব, বন্ধুত্ব, হতাশা, বিদ্রোহ কিংবা নিজের মতো করে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা—সবকিছু তার গানে নতুনভাবে ধরা দিত। তিনি প্রচলিত অর্থে নিখুঁত বা মসৃণ কণ্ঠের গায়ক হওয়ার চেষ্টা করেননি। বরং নিজের কণ্ঠের স্বাভাবিক খসখসে আবেগকেই শক্তিতে পরিণত করেছিলেন। আর এখানেই জেমস অন্য অনেকের থেকে আলাদা হয়ে ওঠেন।
ফিলিংস পরবর্তীতে নতুন পরিচয় পায়। ব্যান্ডের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় নগর বাউল। নামটির মধ্যেই যেন জেমসের সংগীতভাবনার একটি সুন্দর প্রতিফলন ছিল। একদিকে ‘নগর’, অন্যদিকে ‘বাউল’। অর্থাৎ শহরের আধুনিকতা এবং বাংলার লোকজ আত্মা—দুই ভিন্ন জগতের এক অদ্ভুত মিলন। জেমসের সংগীতকে শুধু পশ্চিমা রকের বাংলা সংস্করণ বললে তার কাজের পুরো ব্যাপ্তি বোঝা যায় না। তিনি রকের শক্তিশালী গিটার, ড্রাম ও মঞ্চভাষাকে গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তার ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন বাংলার মাটি ও মানুষের অভিজ্ঞতা। তার গানে শহরের রাস্তা যেমন আছে, তেমনি আছে গ্রামের স্মৃতি। আধুনিক রকের সঙ্গে লোকজ সুর, দেশি বাদ্যযন্ত্র ও বাংলার কথ্য ভাষার নানা উপাদান মিশে তৈরি হয়েছে তার নিজস্ব সংগীতভুবন।
জেমস নিজেই রক ও ফোকসংগীতের ভেতরের আবেগের মিলের কথা বলেছেন। তার কাছে জিম মরিসন কিংবা লালন—দুজন ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভিন্ন সংগীতধারার মানুষ হলেও তাদের প্রকাশের গভীরে রয়েছে মানুষের ভেতরের তাড়না। প্রচলিত সীমার বাইরে গিয়ে নিজের অনুভূতিকে প্রকাশ করার যে আকাঙ্ক্ষা, সেটিই তাদের এক জায়গায় নিয়ে আসে। জেমসের সংগীতেও সেই প্রবণতা স্পষ্ট। তার রক শুধু শব্দের তীব্রতা নয়, বরং নিজের সময় ও সমাজকে নিজের মতো করে দেখার একটি মাধ্যম। তাই তার গানের মধ্যে কখনো শহরের অস্থিরতা, কখনো প্রান্তিক মানুষের জীবন, কখনো প্রেম-বিরহ, আবার কখনো বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির ছায়া দেখা যায়।
নব্বইয়ের দশকে এসে জেমসের জনপ্রিয়তা নতুন মাত্রা পায়। মঞ্চে তার উপস্থিতি হয়ে ওঠে আলাদা এক আকর্ষণ। গিটার হাতে তিনি যখন মঞ্চে উঠতেন, সামনে থাকা দর্শকেরা শুধু গান শুনত না, তারা যেন একটি অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে যেত। হাজার হাজার মানুষ তার সঙ্গে গলা মিলিয়ে গান গাইত, চিৎকার করত, লাফিয়ে উঠত। জেমসের মঞ্চে ‘পাগলামি’ ছিল, কিন্তু সেই পাগলামির মধ্যে ছিল এক ধরনের মুক্তি। প্রতিদিনের জীবনে মানুষকে যেসব নিয়ম, দায়িত্ব ও সামাজিক সংযমের মধ্যে থাকতে হয়, কনসার্টের কয়েক ঘণ্টায় তারা যেন সেসব ভুলে নিজেদের আবেগ প্রকাশের সুযোগ পেত। আর জেমস হয়ে উঠতেন সেই সম্মিলিত আবেগের কেন্দ্র।
এই সময়েই তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘গুরু’ শব্দটি। এটি শুধু একটি ডাকনাম ছিল না; সময়ের সঙ্গে এটি তার মঞ্চপরিচয়েরই অংশ হয়ে ওঠে। গিটার হাতে জেমসের যে অবয়ব তৈরি হয়েছিল, তা বাংলাদেশের রকসংগীতের নিজস্ব একটি আইকনে পরিণত হয়। তার পোশাক, চেহারা, চুল, সানগ্লাস, কণ্ঠ এবং মঞ্চে চলাফেরা—সবকিছু মিলিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন এমন একটি রকস্টার ইমেজ, যার অনুকরণ অনেকেই করেছেন, কিন্তু যার জায়গাটি কেউ নিতে পারেনি।
জেমসের জনপ্রিয়তা শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বাংলা ব্যান্ডসংগীতের কারণে পশ্চিমবঙ্গেও তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। সেই সূত্রেই ভারতীয় সংগীত পরিচালক প্রীতমের সঙ্গে তার কাজের সুযোগ তৈরি হয়। এরপর আসে এমন একটি অধ্যায়, যা তার ক্যারিয়ারকে বাংলাদেশের গণ্ডির অনেক বাইরে নিয়ে যায়। বলিউডের ‘গ্যাংস্টার’ চলচ্চিত্রে তার কণ্ঠে প্রকাশিত হয় ‘ভিগি ভিগি’। গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং ভারতের মূলধারার শ্রোতাদের কাছেও জেমসের কণ্ঠ পরিচিত হয়ে ওঠে। এরপর ‘ওহ লামহে’, ‘লাইফ ইন এ… মেট্রো’ এবং ‘ওয়ার্নিং’-এর মতো চলচ্চিত্রেও তিনি গান করেন। ‘রিশতে’, ‘আলবিদা’ ও ‘বেবাসি’র মতো গান তার কণ্ঠকে নতুন শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেয়। একজন বাংলাদেশি রকশিল্পীর কণ্ঠ যে বলিউডের মতো বিশাল একটি সংগীতবাজারেও আলাদা পরিচিতি তৈরি করতে পারে, জেমস তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে ওঠেন।
বলিউডে কাজ করার সময় তার সামনে ভারতের সংগীতজগতে আরও বড়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগও এসেছিল। কিন্তু তিনি নিজের দেশ ও নিজের সংগীতের সঙ্গে সম্পর্কটাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। বিদেশের বড় সুযোগের চেয়েও বাংলাদেশে নিজের জায়গায় থেকে কাজ করার সিদ্ধান্তই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ জেমসের সংগীতের শিকড় যে জায়গায়, সেই জায়গাটি ছিল বাংলাদেশ। এখানকার মানুষ, এখানকার ভাষা, এখানকার জীবন আর এখানকার শ্রোতারাই তার শিল্পীসত্তার সবচেয়ে বড় অংশ।
সংগীতের পাশাপাশি বিজ্ঞাপন, অভিনয় ও প্রযোজনার সঙ্গেও জেমস যুক্ত হয়েছেন। বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করেছেন, চলচ্চিত্রে উপস্থিত হয়েছেন এবং গাজী আহমেদ শুভ্রর সঙ্গে রেড ডট এন্টারটেইনমেন্ট পরিচালনার মাধ্যমে বিনোদন প্রযোজনার ক্ষেত্রেও কাজ করেছেন। অর্থাৎ মঞ্চের সামনে যে জেমসকে মানুষ দেখেছে, তার বাইরে নেপথ্যেও তিনি সৃজনশীল নানা কাজে যুক্ত ছিলেন। তবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় সবসময়ই থেকেছে সংগীতশিল্পী হিসেবে।
বাংলা চলচ্চিত্রেও তার প্লেব্যাকের যাত্রা ছিল উল্লেখযোগ্য। চলচ্চিত্রের গানে তার কণ্ঠ আবারও প্রমাণ করে যে তিনি শুধু ব্যান্ডসংগীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো শিল্পী নন। তার কণ্ঠের নিজস্বতা বিভিন্ন ধরনের সংগীতের মধ্যেও তাকে আলাদা করে চিনিয়ে দিতে সক্ষম। ‘দেশা: দ্য লিডার’ এবং ‘সত্তা’র মতো চলচ্চিত্রের গানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা পুরুষ প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে স্বীকৃতিও অর্জন করেন তিনি।
তবে জেমসের গল্প শুধু সাফল্যের গল্প নয়। এই দীর্ঘ পথচলায় ব্যক্তিগত জীবনে এসেছে নানা পরিবর্তন, এসেছে হারানোর বেদনাও। সংগীতজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি হারিয়েছেন তার বাবা-মাকে। মাকে ঘিরে তার গানে যে আবেগ, সেটি কেবল একজন শিল্পীর কণ্ঠের আবেগ নয়, বরং ব্যক্তিগত স্মৃতির গভীরতাও বহন করে। নিজের পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনকে অবশ্য তিনি সবসময়ই প্রচারের আলো থেকে দূরে রাখতে চেয়েছেন। মঞ্চে তিনি যতটা উন্মুক্ত, ব্যক্তিজীবনে ততটাই সংযত। ভক্তরা তার গান জানেন, তার মঞ্চের গল্প জানেন, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের অনেকটাই তিনি নিজের মধ্যে রেখেছেন।
মঞ্চের বাইরে জেমসের জীবন অনেক বেশি শান্ত। বই পড়তে ভালোবাসেন, সিনেমা দেখেন, নির্জনতা উপভোগ করেন। সাহিত্যের মধ্যে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ ও নাগিব মাহফুজের মতো লেখকদের প্রতি তার আগ্রহ রয়েছে। আর কয়েক বছর ধরে ফটোগ্রাফিও তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শখ হয়ে উঠেছে। বিদেশে কনসার্ট করতে গেলে অবসর সময়ে ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। বিশেষ করে প্রকৃতি ও ল্যান্ডস্কেপের ছবি তুলতে পছন্দ করেন। যে মানুষটি মঞ্চে হাজারো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের আবেগ প্রকাশ করেন, সেই মানুষটিই আবার অবসরে ক্যামেরার লেন্সের মধ্য দিয়ে নিঃশব্দ পৃথিবীকে দেখতে ভালোবাসেন।
বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও জেমসের জীবনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের যে প্রজন্মের সঙ্গে তিনি বেড়ে উঠেছেন, তাদের অনেকেই আজও তার দীর্ঘদিনের বন্ধু ও সহযোদ্ধা। আইয়ুব বাচ্চু, হামিন আহমেদ, মাকসুদ, পার্থ বড়ুয়াসহ আরও অনেক শিল্পীর সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল সেই সময়, যখন বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীত নিজের পরিচয় তৈরি করছিল। তাদের বন্ধুত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের স্মৃতিও।
কিন্তু এত দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পরও জেমস নিজের জন্য খুব নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য ঠিক করে এগিয়ে চলেননি। তার কাছে গান ছিল আনন্দের জায়গা। তিনি যে কাজ করতে ভালোবাসেন, সেটিই করেন। জনপ্রিয়তা, পুরস্কার কিংবা তারকাখ্যাতি—এসব তার জীবনে এসেছে, কিন্তু এগুলোকে তিনি শুরু থেকেই লক্ষ্য বানাননি। তার নিজের দর্শন অনেক সহজ—গান করতে ভালো লাগে বলেই গান করেন। আর যদি কোনোদিন কিছুই না হতো, তবুও তিনি গান করতেন।
সম্ভবত এ কারণেই এত বছর পরও জেমসের সঙ্গে তার শ্রোতাদের সম্পর্কটা শুধু জনপ্রিয়তার সম্পর্ক নয়। একজন শিল্পী যখন নিজের জীবনের অনুভূতিকে এমনভাবে গানের মধ্যে ঢেলে দিতে পারেন যে শ্রোতা সেখানে নিজের গল্প খুঁজে পান, তখন সেই শিল্পী সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যান না। জেমসের ক্ষেত্রেও সেটিই হয়েছে। আশির দশকের তরুণ যে শিল্পী গিটার হাতে নিজের পথ খুঁজছিলেন, তিনি নব্বইয়ের দশকে হয়ে উঠেছেন রকসংগীতের বড় একটি নাম, এরপর একবিংশ শতকে পৌঁছে গেছেন দেশের সীমানার বাইরে, আবার ফিরে এসেছেন নিজের মাটি ও মানুষের কাছে।
আজও মঞ্চে জেমস গিটার হাতে দাঁড়ালে দৃশ্যটা খুব একটা বদলায় না। সামনে অসংখ্য মানুষ, চারদিকে আলো, আর তার কণ্ঠের সঙ্গে একসঙ্গে গেয়ে ওঠে একটি বিশাল জনসমুদ্র। সময় বদলেছে, সংগীতের প্রযুক্তি বদলেছে, শ্রোতাদের রুচি বদলেছে, নতুন নতুন শিল্পী এসেছে; কিন্তু জেমসের কণ্ঠের আলাদা পরিচয়টি থেকে গেছে।
নওগাঁয় জন্ম নেওয়া সেই দুরন্ত ছেলেটি একদিন পরিবারের সঙ্গে অভিমান করে ঘর ছেড়েছিল। চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিংয়ের ছোট্ট ঘরে গিটার হাতে যে তরুণ নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছিল, সে হয়তো তখনও জানত না তার সামনে কত দীর্ঘ পথ পড়ে আছে। ফিলিংস থেকে নগর বাউল, ‘স্টেশন রোড’ থেকে ‘অনন্যা’, বাংলাদেশের মঞ্চ থেকে বলিউড, আর একজন তরুণ গিটারিস্ট থেকে কোটি মানুষের প্রিয় ‘গুরু’—এই পুরো যাত্রা আসলে নিজের মতো করে বাঁচার এবং নিজের মতো করে গান করার গল্প।
জেমসের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো একটি অ্যালবাম, কোনো একটি গান কিংবা কোনো একটি পুরস্কার নয়। তার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো তিনি বাংলা রকসংগীতকে নিজের ভাষায় কথা বলার একটি শক্তিশালী পথ দেখিয়েছেন। পশ্চিমা রকের শক্তিকে তিনি বাংলার মাটি, মানুষের জীবন আর নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে মিশিয়ে এমন একটি স্বর তৈরি করেছেন, যেটিকে আলাদা করে চিনতে কোনো পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না।
কণ্ঠ শুনলেই বোঝা যায়—এ জেমস।
গিটার শুনলেই বোঝা যায়—এ জেমস।
আর মঞ্চে যখন হাজারো মানুষ একসঙ্গে তার সঙ্গে গলা মেলায়, তখন বোঝা যায়—কেন কয়েক দশক পরও তিনি শুধু একজন গায়ক নন, তিনি ভক্তদের কাছে সেই একজনই—
গুরু জেমস।
আরও খবর
সুরের পদ্মাবতী সাবিনা ইয়াসমীন
বাংলা গানের ইতিহাসে কিছু কণ্ঠ শুধু গান গায় না, বরং সময়কে ধারণ করে। কিছু কণ্ঠ মানুষের আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, দেশপ্রেম আর...
প্লেব্যাক সম্রাট এন্ড্রু কিশোরের অজানা গল্প
বাংলা চলচ্চিত্রের গানের ইতিহাসে কিছু কণ্ঠ আছে, যেগুলো শুধু গান হয়ে মানুষের কানে পৌঁছায় না, বরং মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে...
‘দামাদাম গার্ল’ থেকে কিংবদন্তি রুনা লায়লা
উপমহাদেশের সংগীতজগতে এমন কিছু নাম আছে, যাদের পরিচয় কোনো একটি দেশ- কোনো একটি ভাষা কিংবা কোনো একটি সংগীতধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ...
আত্মজীবনী লিখলেন অঞ্জন দত্ত
সংগীতশিল্পী হিসেবে পরিচিত হলেও অঞ্জন দত্তের সৃজনশীল জগৎ বহুমাত্রিক। গান লেখা, সুর করা ও গাওয়ার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন সিনেমার সঙ্গে...
‘অঞ্জনা’ নিয়ে আসছেন মনির খান
দেশের শ্রোতাপ্রিয় সংগীতশিল্পী মনির খান। এই গায়কের ‘অঞ্জনা’ সিরিজের গানগুলো তার ভক্তদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়। প্রতি বছরই এ সংগীতশিল্পী জানুয়ারির...
আমি শান্তি চাই, একটু বাঁচতে সাহায্য করুন: তাহসান
গায়ক ও অভিনেতা তাহসান খান এবং তার স্ত্রী রোজাকে নিয়ে অনেক আলোচনা। বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই তাদের দাম্পত্য জীবনে ভাঙনের...
