বাংলা চলচ্চিত্রের পর্দায় নায়ক-নায়িকার প্রেম, বিরহ কিংবা আবেগের মুহূর্তগুলোকে সুরের মায়ায় জীবন্ত করে তুলেছেন যে কণ্ঠশিল্পীরা, তাঁদের মধ্যে অন্যতম কনকচাঁপা। তাঁর কণ্ঠে প্রেম পেয়েছে কোমলতা, বিরহ পেয়েছে গভীরতা, আর অসংখ্য চলচ্চিত্রের গান হয়ে উঠেছে দর্শক-শ্রোতার স্মৃতির অংশ। ‘তুমি আমার এমনই একজন’, ‘অনেক সাধনার পরে আমি পেলাম তোমার মন’, ‘যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে’ কিংবা ‘ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’—এমন বহু গান আজও বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছে পরিচিত ও প্রিয়। কয়েক দশকের সংগীতজীবনে তিনি শুধু চলচ্চিত্রের প্লে-ব্যাক শিল্পী হিসেবেই নয়, আধুনিক গানের শিল্পী, লেখক এবং রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত একজন মানুষ হিসেবেও নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছেন। কীভাবে সংগীতের জগতে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল, কীভাবে তিনি হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচিত নারী কণ্ঠশিল্পী, আর গানের বাইরে তাঁর জীবনের গল্পই বা কেমন—আজকের আয়োজনে থাকছে এসব প্রশ্নের উত্তর।

রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা, যিনি সংগীতাঙ্গনে কনকচাঁপা নামেই ব্যাপক পরিচিত, জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকায়। তাঁর বাবা আজিজুল হক মোর্শেদ। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায় হলেও তাঁর পৈতৃক বাড়ি সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে। ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। পরিবারের উৎসাহ এবং নিজের সংগীতের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে ধীরে ধীরে গানের জগতে এগিয়ে নিয়ে যায়। শৈশবেই তাঁর প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। মাত্র নয় বছর বয়সে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় শিশু-কিশোর অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’তে অংশ নিয়ে তিনি পুরস্কার অর্জন করেন। এ ছাড়া রেডিওর ‘কলকাকলি’ অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে শ্রোতাদের কাছে তাঁর কণ্ঠ পৌঁছাতে শুরু করে। ছোটবেলার এই অভিজ্ঞতাগুলো পরবর্তী সময়ে তাঁর সংগীতজীবনের ভিত গড়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

গানের প্রতি ভালোবাসাকে পেশাদার দক্ষতায় রূপ দিতে কনকচাঁপা নিয়মিত সংগীতচর্চা করেছেন। তিনি বাংলাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী বশীর আহমেদের কাছে দীর্ঘদিন উচ্চাঙ্গসংগীত, নজরুলসংগীতসহ ভারতীয় সংগীতের বিভিন্ন ধারায় তালিম নেন। সংগীতের এই প্রশিক্ষণ তাঁর গায়কীতে সুরের নিয়ন্ত্রণ, আবেগের প্রকাশ এবং বিভিন্ন ধরনের গান পরিবেশনের সক্ষমতা তৈরি করতে সাহায্য করে। পরবর্তী সময়ে আধুনিক গান থেকে শুরু করে চলচ্চিত্রের রোমান্টিক গান, বিরহের গান ও লোকসংগীত—বিভিন্ন ধারায় তাঁর কণ্ঠের ব্যবহার শ্রোতাদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে।

বিভিন্ন জীবনীমূলক প্রতিবেদনে ১৯৮৪ সালকে তাঁর পেশাদার সংগীতজীবনের শুরুর সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই বছর তাঁর ব্যক্তিজীবনেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। সুরকার ও সংগীত পরিচালক মইনুল ইসলাম খানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। সংগীতের সঙ্গে যুক্ত একজন মানুষের সঙ্গে জীবন ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও সংগীতের একটি বিশেষ সংযোগ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে কনকচাঁপা তাঁর বাবা ও স্বামীর অবদানকে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গানে কনকচাঁপার প্রতিষ্ঠা এক দিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে করতে তিনি নিজের কণ্ঠের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছেন। চলচ্চিত্রের পর্দায় অভিনয়শিল্পীর অভিনয়ের সঙ্গে গানের আবেগকে মিলিয়ে দেওয়া প্লে-ব্যাক শিল্পীর অন্যতম বড় কাজ। সেই কাজের জন্য কণ্ঠের মাধুর্যের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুভূতি প্রকাশের দক্ষতা, সুরের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং গানের পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা। কনকচাঁপার গানে এই বৈশিষ্ট্যগুলোই শ্রোতাদের আকৃষ্ট করেছে। প্রেমের গানে তাঁর কণ্ঠে পাওয়া যায় কোমলতা, বিরহের গানে অনুভূত হয় মনখারাপের আবেশ, আর আবেগঘন গানে তাঁর পরিবেশনা শ্রোতার মনে আলাদা ছাপ ফেলে।

দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি তিন হাজারেরও বেশি চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের রোমান্টিক গানের জনপ্রিয়তায় তাঁর অবদান স্মরণীয়। জনপ্রিয় অভিনেত্রী শাবনূরের অভিনীত বহু চলচ্চিত্রের গানে কনকচাঁপার কণ্ঠ শোনা গেছে। নব্বইয়ের দশক ও পরবর্তী সময়ে বাংলা চলচ্চিত্রের গান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাই তাঁর নাম স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। তাঁর কণ্ঠের সঙ্গে পর্দার রোমান্টিক দৃশ্যগুলোর এক ধরনের পরিচিত আবহ তৈরি হয়েছিল, যা অনেক দর্শকের কাছে সেই সময়ের চলচ্চিত্রের স্মৃতির অংশ হয়ে রয়েছে।

তবে কনকচাঁপার সংগীতজীবন কেবল চলচ্চিত্রের গানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আধুনিক বাংলা গান, নজরুলসংগীত ও লোকগীতিতেও তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন। বিভিন্ন ধারার গানে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে বহুমাত্রিক শিল্পী হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। তাঁর গাওয়া গানগুলোতে যেমন প্রেমের আবেগ পাওয়া যায়, তেমনি রয়েছে বিরহ, অপেক্ষা, অভিমান এবং জীবনের নানা অনুভূতির প্রকাশ। এই বৈচিত্র্যই তাঁর সংগীতজীবনকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

কনকচাঁপার জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় গান, যেগুলোর সুর ও কথা মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে মিশে গেছে। ‘অনেক সাধনার পরে আমি পেলাম তোমার মন’, ‘তুমি আমার এমনই একজন’, ‘যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে জীবনে অমর হয়ে রয়’, ‘তোমাকে চাই শুধু তোমাকে চাই’, ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’, ‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা’, ‘ছোট্ট একটা জীবন’, ‘ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’, ‘তোমায় দেখলে মনে হয়’, ‘আকাশ ছুঁয়েছে মাটিকে’, ‘নীলাঞ্জনা নামে ডেক না’ এবং ‘আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি’—এমন অনেক গান তাঁর কণ্ঠে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

এর মধ্যে কয়েকটি গান তিনি খালিদ হাসান মিলু ও এন্ড্রু কিশোরের মতো জনপ্রিয় শিল্পীদের সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে পরিবেশন করেছেন। তাঁদের কণ্ঠের সমন্বয়ে তৈরি গানগুলো বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত। একটি জনপ্রিয় গানের পেছনে গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক, যন্ত্রশিল্পী এবং সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত শ্রম থাকে। কনকচাঁপার কণ্ঠ সেই সম্মিলিত সৃষ্টিকে শ্রোতার হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাঁর গাওয়া অনেক গান চলচ্চিত্রের নির্দিষ্ট দৃশ্যের সীমা ছাড়িয়ে আলাদাভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বহু শ্রোতার কাছে এসব গান হয়ে উঠেছে ভালোবাসা, অপেক্ষা, বিচ্ছেদ কিংবা পুরোনো দিনের স্মৃতি মনে করার উপলক্ষ।

চলচ্চিত্রের গানের পাশাপাশি একক ও যৌথ অ্যালবামেও কনকচাঁপা কাজ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত অ্যালবামগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘আবার এসেছি ফিরে’, ‘আমার মনের বাসনা’, ‘আমার প্রেম’, ‘বিরহের স্বরলিপি’, ‘গানের খাতায় স্বরলিপি’, ‘কোকিলা’, ‘মধু মালতি’, ‘প্রেমের নাম বেদনা’, ‘তাল পাতার বাঁশি’ এবং ‘আমার প্রিয় গান’ সিরিজের বিভিন্ন সংকলন। এ ছাড়া পুরোনো দিনের গান ও বিভিন্ন ধরনের আধুনিক গানের সংকলনেও তাঁর সংগীতচর্চার পরিচয় পাওয়া যায়। চলচ্চিত্রের গান নিয়ে প্রকাশিত ‘আবার এসেছি ফিরে’ অ্যালবামটিও তাঁর কাজের তালিকায় উল্লেখযোগ্য।

বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর একক অ্যালবামের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। কোনো কোনো প্রতিবেদনে ৩০টির বেশি, আবার কোথাও ৩৫টি একক অ্যালবামের উল্লেখ রয়েছে। তাই নির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি না করে বলা যায়, দীর্ঘ ক্যারিয়ারে একক ও যৌথ—দুই ধরনের অ্যালবামেই তিনি উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। চলচ্চিত্রের গান এবং অ্যালবামের গান—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর কণ্ঠ শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি পেয়েছে।

দীর্ঘদিনের সংগীতসাধনার স্বীকৃতি হিসেবে কনকচাঁপা অর্জন করেছেন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার। তাঁর উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে রয়েছে তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে সম্মাননা লাভ। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ‘লাভ স্টোরি’, ‘প্রেমের তাজমহল’ এবং ‘এক টাকার বউ’ চলচ্চিত্রে গাওয়া গানের জন্য তিনি যথাক্রমে ১৯৯৫, ২০০১ ও ২০০৮ সালে এই পুরস্কার অর্জন করেন। এ ছাড়া বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কার, দর্শক ফোরাম পুরস্কার, প্রযোজক সমিতির পুরস্কার এবং প্রথম আলো-মেরিল পাঠক জরিপের মতো বিভিন্ন স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি।

এই পুরস্কারগুলো তাঁর দীর্ঘদিনের কাজের গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। তবে কোনো শিল্পীর সাফল্য শুধু পুরস্কারের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। কনকচাঁপার ক্ষেত্রে তাঁর গাওয়া গানগুলো বহু বছর ধরে শ্রোতাদের কাছে পরিচিত থাকা এবং নতুন প্রজন্মের কাছেও সমাদৃত হওয়াটিও তাঁর সংগীতজীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাঁর কণ্ঠে গাওয়া গানগুলো আজও বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সংগীত আয়োজন এবং শ্রোতাদের ব্যক্তিগত পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নেয়।

গানের পাশাপাশি লেখালেখিতেও কনকচাঁপার রয়েছে আলাদা পরিচিতি। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘স্থবির যাযাবর’, ‘মুখোমুখি যোদ্ধা’ এবং ‘মেঘের ডানায় চড়ে’। ২০১০ সালে প্রকাশিত ‘স্থবির যাযাবর’ তাঁর লেখকজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য কাজ। এরপর ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় ‘মুখোমুখি যোদ্ধা’ এবং ২০১৬ সালে ‘মেঘের ডানায় চড়ে’। ২০২০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর স্মৃতিচারণমূলক ও আত্মজীবনীধর্মী বই ‘কাটা ঘুড়ি’। এসব বইয়ে তাঁর চিন্তা, অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়।

বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে তাঁর কলামও প্রকাশিত হয়েছে। ফলে সংগীতের বাইরে নিজের ভাবনা, অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ প্রকাশের জন্য তিনি লেখালেখিকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন। গানের মাধ্যমে যেখানে সুর ও কণ্ঠ দিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করা হয়, সেখানে লেখালেখির মাধ্যমে শব্দের সাহায্যে তুলে ধরা যায় চিন্তা ও জীবনবোধ। কনকচাঁপার সৃজনশীল জীবনে এই দুই ধারার উপস্থিতি তাঁকে আরও বহুমাত্রিক পরিচয় দিয়েছে।

তাঁর ব্যক্তিজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছেন স্বামী মইনুল ইসলাম খান। তিনি একজন সুরকার ও সংগীত পরিচালক। সংগীতের সঙ্গে যুক্ত এই মানুষটির সঙ্গে কনকচাঁপার সম্পর্ক তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এবং শিল্পীজীবনের গল্পেও বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। কনকচাঁপা বিভিন্ন সময়ে তাঁর স্বামীর সহযোগিতা ও সমর্থনের কথা উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে বাবা আজিজুল হক মোর্শেদের অবদানকেও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। একজন শিল্পীর দীর্ঘ পথচলায় পরিবারের সমর্থন, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কনকচাঁপার জীবনেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সংগীতচর্চা পাশাপাশি এগিয়েছে।

সংগীতাঙ্গনে পরিচিতির পাশাপাশি কনকচাঁপা রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হয়েছেন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির মনোনয়নে সিরাজগঞ্জ-১, অর্থাৎ কাজিপুর আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাঁর পৈতৃক শিকড় এই অঞ্চলে হওয়ায় কাজিপুরের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক সম্পর্কও রয়েছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বাইরে সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে নিজের সম্পৃক্ততা প্রকাশ করেন।

পরবর্তী সময়েও রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন সিরাজগঞ্জ-১ আসনে। তবে দলীয় মনোনয়ন পাননি। এরপর সংরক্ষিত নারী আসনের জন্যও তিনি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন। ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির চূড়ান্ত মনোনীতদের তালিকাতেও তাঁর নাম ছিল না। এ বিষয়ে নিজের প্রতিক্রিয়ায় তিনি আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেন এবং দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়ার ইচ্ছার কথা জানান। তাঁর এই রাজনৈতিক পথচলা সংগীতজীবনের বাইরে জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা নিয়ে আলোচনা করতে হলে তাঁর নির্বাচনী অংশগ্রহণ এবং নিজের বক্তব্যকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে কনকচাঁপার জীবন কেবল একজন জনপ্রিয় গায়িকার সাফল্যের গল্প নয়। শৈশবের সংগীতচর্চা, সংগীতের তালিম, চলচ্চিত্রের গানে প্রতিষ্ঠা, অসংখ্য জনপ্রিয় গান, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন, বই প্রকাশ, কলাম লেখা এবং রাজনীতিতে অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে তাঁর পথচলা নানা অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। কয়েক দশক ধরে তিনি বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে কাজ করেছেন এবং তাঁর কণ্ঠে গাওয়া বহু গান শ্রোতাদের স্মৃতিতে জায়গা করে নিয়েছে।

সময়ের সঙ্গে সংগীতের ধরন বদলায়, নতুন শিল্পীরা আসেন, নতুন গান জনপ্রিয় হয়। তবু কিছু কণ্ঠ থেকে যায় শ্রোতাদের ব্যক্তিগত স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে। কনকচাঁপার গাওয়া অনেক গানও তেমনই। এসব গান শুনলে কারও মনে পড়ে পুরোনো চলচ্চিত্র, কারও মনে জেগে ওঠে ভালোবাসার স্মৃতি, আবার কারও কাছে ফিরে আসে হারিয়ে যাওয়া কোনো সময়ের অনুভূতি। এই দীর্ঘস্থায়ী শ্রোতাপ্রিয়তাই তাঁর সংগীতজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গান ও আধুনিক সংগীতের ইতিহাসে কনকচাঁপার অবদান তাঁর গাওয়া গানগুলোর মধ্য দিয়েই বারবার ফিরে আসে। তাঁর জীবন ও কর্মের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন শিল্পীর পরিচয় শুধু মঞ্চের আলো কিংবা পুরস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে মানুষের দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের মধ্যেও সেই পরিচয় বেঁচে থাকে।

কালজয়ী প্লে-ব্যাক শিল্পী কনকচাঁপার জীবন, সংগীতসাধনা, জনপ্রিয় গান, লেখালেখি এবং রাজনৈতিক পথচলার এই গল্প আপনাদের কেমন লাগল, তা কমেন্টে জানাতে পারেন। তাঁর গাওয়া কোন গানটি আপনার সবচেয়ে প্রিয়, সেটিও আমাদের জানাতে ভুলবেন না। ভিডিওটি ভালো লাগলে লাইক দিন, পরিচিতজনদের সঙ্গে শেয়ার করুন এবং বাংলাদেশের গুণী শিল্পীদের জীবন ও অবদান নিয়ে আরও তথ্যসমৃদ্ধ ভিডিও দেখতে চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে সঙ্গে থাকুন। আবারও ফিরে আসব বাংলা সংগীতের আরেকজন গুণী শিল্পীর জীবন ও সৃষ্টির গল্প নিয়ে। ততক্ষণ পর্যন্ত ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post নগর বাউল জেমসের জীবনকথা
Close

মিনা পাল থেকে রূপালি পর্দার কিংবদন্তি কবরী

তেরো বছর বয়সী এক কিশোরী। চোখে তখন বড় হওয়ার স্বপ্ন, মনে অভিনয়ের আকাঙ্ক্ষা। চট্টগ্রামের একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা সেই মেয়েটি হয়তো তখনও জানতেন...

ঢাকাই সিনেমার হাসির রাজা দিলদার

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাদের চলে যাওয়ার পরও তাদের জনপ্রিয়তা এতটুকু কমে না। সময়ের সঙ্গে বদলে যায় চলচ্চিত্র, বদলে যায় দর্শকের রুচি,...

ঢাকাই সিনেমার শ্রীদেবী, চম্পা

https://www.youtube.com/watch?v=8QBasJKBpuI বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আকাশে এমন কিছু তারকা আছেন, যাঁদের নাম উচ্চারণ করলেই একটি সময়, একটি প্রজন্ম আর অসংখ্য সিনেমার স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তাঁদের...

চিরসবুজ নায়ক জাফর ইকবাল

একটা সময় ছিল, যখন পর্দায় একজন নায়ক এলেই বদলে যেত পুরো পরিবেশ। গিটার হাতে, চোখে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস, চুলের স্টাইলে আধুনিকতার ছোঁয়া, আর মুখে এমন...

রুপালি পর্দায় পূর্ণিমার উত্থান | কিশোরী বয়সে সিনেমায়, তারপর তারকাখ্যাতি

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এমন কিছু মুখ আছে, যাদের দেখলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি সময়… মনে পড়ে যায় সেইসব সিনেমার গল্প, গান আর প্রেক্ষাগৃহভরা দর্শকের উচ্ছ্বাস।...