https://www.youtube.com/watch?v=8QBasJKBpuI
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আকাশে এমন কিছু তারকা আছেন, যাঁদের নাম উচ্চারণ করলেই একটি সময়, একটি প্রজন্ম আর অসংখ্য সিনেমার স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তাঁদের কেউ ছিলেন স্বপ্নের নায়িকা, কেউ ছিলেন জনপ্রিয়তার প্রতীক, আবার কেউ অভিনয়ের গভীরতা দিয়ে নিজেদের এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যেখানে পৌঁছানো সবার পক্ষে সম্ভব নয়। চম্পা সেই বিরল শিল্পীদের একজন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তাঁর পথচলা শুধু একজন নায়িকার গল্প নয়, এটি একজন শিল্পীর ধীরে ধীরে নিজেকে আবিষ্কার করার গল্প। যে মেয়েটি একসময় শ্রীদেবীর অভিনয় অনুকরণ করতেন, সেই মেয়েটিই পরবর্তী সময়ে নিজের অভিনয় দিয়ে বাংলাদেশের দর্শকের কাছে হয়ে উঠেছিলেন এক স্বতন্ত্র পরিচয়ের নাম—চম্পা।
তাঁর আসল নাম গুলশান আরা আখতার চম্পা। ১৯৬৫ সালের ৫ জানুয়ারি যশোরে তাঁর জন্ম। জন্ম থেকেই যেন শিল্পের আবহে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। তাঁর বাবা নিযামুদ্দিন এবং মা ডা. জাহানারা আখতার ছিলেন শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা মানুষ। তাঁর মা পেশায় ছিলেন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে চম্পা ছিলেন সবার ছোট। আর এই পরিবারটির সঙ্গে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। কারণ তাঁর দুই বোন শুচন্দা ও ববিতা তখনকার চলচ্চিত্রে নিজেদের উজ্জ্বল অবস্থান তৈরি করেছিলেন। ফলে চম্পার শৈশবের বাড়িটা ছিল অন্য অনেক পরিবারের চেয়ে আলাদা। সেখানে শুধু পড়াশোনা কিংবা সংসারের গল্প ছিল না, ছিল গান, আবৃত্তি, অভিনয়, সাংস্কৃতিক আড্ডা আর শিল্প নিয়ে আলোচনা। খুব স্বাভাবিকভাবেই সেই পরিবেশ ছোট্ট চম্পার মনেও শিল্পের প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ তৈরি করে।
তবে তাঁর শৈশবের গল্প শুধু আনন্দ আর সংস্কৃতির গল্প ছিল না। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি হারান তাঁর মাকে। একটি শিশুর জীবনে মায়ের চলে যাওয়া যে কত বড় শূন্যতা তৈরি করতে পারে, সেটি হয়তো কোনো শব্দ দিয়েই পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এত অল্প বয়সে মাকে হারানোর সেই কষ্ট তাঁর জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। কিন্তু সময় মানুষকে অনেক কিছু শেখায়। পরিবারের ভালোবাসা, বড় বোনদের সান্নিধ্য এবং চারপাশের সাংস্কৃতিক পরিবেশ ধীরে ধীরে তাঁকে সেই শূন্যতার মধ্য থেকেও নিজের মতো করে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত ও সাহসী। কৈশোরে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেন। মাঠের খেলাধুলা তাঁকে যেমন দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল, তেমনি পারিবারিক সাংস্কৃতিক পরিবেশ তাঁর মধ্যে তৈরি করেছিল শিল্পীসত্তার ভিত।
অভিনয়ের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ তখনও তাঁর ছিল না। কিন্তু সিনেমা দেখার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের মতো করে অভিনয় শেখার চেষ্টা করতেন। ভারতীয় অভিনেত্রী শাবানা আজমি, স্মিতা পাটিল এবং বিশেষ করে শ্রীদেবীর অভিনয় তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। শ্রীদেবীর চোখের অভিব্যক্তি, মুখের পরিবর্তন, হাসি থেকে বিষাদে চলে যাওয়ার ক্ষমতা কিংবা কোনো সংলাপ ছাড়াই অনুভূতি প্রকাশ করার দক্ষতা চম্পাকে মুগ্ধ করত। তিনি শ্রীদেবীর অভিনয় অনুকরণ করতেন। কিন্তু শিল্পীর পথ তো অনুকরণে শেষ হয় না। একসময় সেই অনুকরণই তাঁকে নিজের অভিনয়ভাষা খুঁজে নিতে সাহায্য করেছিল। পরবর্তী সময়ে দর্শক যখন চম্পাকে পর্দায় দেখেছে, তখন তাঁকে আর কারও ছায়া বলে মনে হয়নি। বরং তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন চম্পা।
চম্পার অভিনয়জীবনের শুরু অবশ্য বড় পর্দায় নয়, টেলিভিশনে। ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটক ‘দূর সাঁতার’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবনের সূচনা হয়। নাটকটি পরিচালনা করেছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। সেই সময়ের দর্শক নতুন একটি মুখকে দেখতে পেলেন, আর সেই মুখের মধ্যে ছিল স্বাভাবিক অভিনয়ের এক আলাদা আকর্ষণ। ‘দূর সাঁতার’-এর পর একে একে তিনি অভিনয় করেন ‘এখানে নোঙর’, ‘আকাশ বাড়িয়ে দাও’, ‘খোলা দরজা’, ‘অপোয়া’সহ বিভিন্ন নাটকে। ধীরে ধীরে টেলিভিশনের দর্শকের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল আরও বড় একটি অধ্যায়। অপেক্ষা করছিল রুপালি পর্দা।
১৯৮৬ সালে সেই সুযোগ আসে। চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক ঘটে ‘তিন কন্যা’ ছবির মাধ্যমে। ছবিটির প্রযোজক ছিলেন তাঁর বোন শুচন্দা। আর অভিষেক ছবিতেই চম্পা এমন একটি চরিত্রে অভিনয় করেন, যা তাঁর অভিনয়ক্ষমতার একটি ভিন্ন দিক তুলে ধরেছিল। তিনি অভিনয় করেছিলেন একজন পুলিশ ইন্সপেক্টরের ভূমিকায়। এরপর ‘নিষ্পাপ’ ও ‘ভেজা চোখ’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করে তিনি দর্শকের কাছে আরও পরিচিত হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রে তাঁর অবস্থান শক্ত হতে থাকে। আশির দশকের শেষভাগ থেকে নব্বইয়ের দশকে এসে চম্পা হয়ে ওঠেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচিত ও ব্যস্ত অভিনেত্রী।
তবে চম্পার বিশেষত্ব ছিল অন্য জায়গায়। তিনি শুধু জনপ্রিয় নায়িকা হয়ে থাকতে চাননি। তাঁর অভিনয়জীবনে যেমন বাণিজ্যিক সিনেমা ছিল, তেমনি ছিল গল্পনির্ভর ও শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র। চরিত্রের ধরন বদলালেও তিনি নিজেকে সেই চরিত্রের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারতেন। কখনো তিনি হয়ে উঠেছেন প্রেমময়ী নারী, কখনো অসহায় স্ত্রী, কখনো সংগ্রামী মা, আবার কখনো সমাজের প্রান্তিক মানুষের প্রতিচ্ছবি। তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল চরিত্রের আবেগকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। ফলে পর্দায় তিনি যখন কাঁদতেন, দর্শক শুধু একজন অভিনেত্রীকে কাঁদতে দেখত না; মনে হতো সত্যিই কোনো একজন মানুষের জীবনের কষ্ট চোখের সামনে দেখছে।
নব্বইয়ের দশক ছিল চম্পার ক্যারিয়ারের অন্যতম সোনালি সময়। একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করে তিনি নিজের অবস্থানকে আরও শক্ত করেন। কিন্তু তাঁর অভিনয়জীবনে এমন একটি চলচ্চিত্র এসেছিল, যা তাঁকে শুধু জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে নয়, একজন শক্তিশালী অভিনয়শিল্পী হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করে। সেই ছবির নাম ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। ১৯৯৩ সালে মুক্তি পাওয়া এই ইন্দো-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনার ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন গৌতম ঘোষ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্র ছিল নদী ও নদীঘেঁষা মানুষের জীবন, দারিদ্র্য, প্রেম, স্বপ্ন, হতাশা এবং বেঁচে থাকার সংগ্রামের এক অসাধারণ চিত্রায়ণ।
এই ছবিতে চম্পা অভিনয় করেছিলেন মালা চরিত্রে। মালা ছিল এমন এক নারী, যার জীবনে বিলাসিতা ছিল না, ছিল না কোনো সহজ পথ। ছিল দারিদ্র্য, ছিল অনিশ্চয়তা, ছিল নদীর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার কঠিন বাস্তবতা। আর সেই চরিত্রটিকেই চম্পা এমনভাবে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন যে মালা আর শুধু একটি সিনেমার চরিত্র হয়ে থাকেনি। সে হয়ে উঠেছিল নদীর পাড়ের হাজারো নারীর প্রতিচ্ছবি। তার চোখে ছিল কষ্ট, মুখে ছিল নীরবতা, জীবনে ছিল সংগ্রাম; কিন্তু সেই সংগ্রামের মধ্যেও ছিল বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা। চম্পার অভিনয়ের স্বাভাবিকতা দর্শক ও সমালোচকদের মুগ্ধ করেছিল। এই ছবির জন্য তিনি অর্জন করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেত্রীর সম্মান। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ শুধু তাঁর ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি নয়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে চম্পার অভিনয় প্রতিভার অন্যতম বড় প্রমাণ হয়ে থাকে। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি দেশের বাইরেও পরিচিতি লাভ করেন।
কিন্তু একজন প্রকৃত শিল্পীর যাত্রা একটি সাফল্যে থেমে থাকে না। চম্পাও থামেননি। সময় বদলেছে, চলচ্চিত্রের ভাষা বদলেছে, দর্শকের রুচি বদলেছে, কিন্তু চরিত্রের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা বদলায়নি। ২০০০ সালে মুক্তি পায় শাহজাহান চৌধুরী পরিচালিত ‘উত্তরের খেপ’। শওকত আলীর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিতে চম্পা অভিনয় করেন একজন প্রান্তিক নারীর চরিত্রে। ছবির নায়ক ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেতা মন্না। কিন্তু এই ছবিতে চম্পার অভিনয় আবারও প্রমাণ করে দেয়, তিনি শুধু নায়িকা নন, তিনি একজন শক্তিশালী চরিত্রাভিনেত্রীও। একজন নারীর জীবনের কষ্ট, সংগ্রাম, বেদনা এবং টিকে থাকার আকাঙ্ক্ষাকে তিনি এমন বাস্তবতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে চরিত্রটি দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে। এই ছবির জন্যও তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেত্রীর সম্মান অর্জন করেন। ‘উত্তরের খেপ’ যেন তাঁর অভিনয়জীবনে আরেকটি সিলমোহর দিয়ে বলেছিল—চম্পা চরিত্রের ভেতরে ঢুকতে জানেন।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি শুধু নায়িকা হিসেবে নয়, পার্শ্বচরিত্রেও নিজের অভিনয়ের শক্তি দেখিয়েছেন। ‘অন্যায় জীবন’-এর জন্য সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পাওয়ার পাশাপাশি ‘শাস্তি’ ও ‘চন্দ্রগ্রহণ’-এর মতো চলচ্চিত্রে পার্শ্ব অভিনেত্রী হিসেবেও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সম্মানিত হন। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে তাঁর চরিত্রের ধরন বদলেছে, কিন্তু অভিনয়ের গভীরতা কমেনি। বরং বয়স ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাঁর অভিনয়ে এসেছে আরও পরিণত ভাব, আরও সংযম, আরও গভীরতা।
চম্পার জীবনের গল্পে চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনেরও একটি আলাদা অধ্যায় রয়েছে। ১৯৮২ সালে তিনি ব্যবসায়ী শাহিদুল ইসলাম খানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের একমাত্র কন্যা এশা। একদিকে তখন তাঁর ব্যস্ত অভিনয়জীবন, অন্যদিকে সংসার ও পরিবার। শুটিং, সিনেমা, দর্শকের ভালোবাসা, তারকাখ্যাতি—সবকিছুর পাশাপাশি তিনি নিজের পারিবারিক জীবনকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। একজন তারকার জীবন বাইরে থেকে যতটা ঝলমলে মনে হয়, তার আড়ালে থাকে অসংখ্য দায়িত্ব, ত্যাগ এবং ব্যক্তিগত সংগ্রাম। চম্পাও সেই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই নিজের পেশা ও পরিবারকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা, অসংখ্য জনপ্রিয় চরিত্র, দর্শকের ভালোবাসা এবং একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার—সব মিলিয়ে চম্পার ক্যারিয়ার বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একটি দীর্ঘ অধ্যায়। তিনি এমন এক সময়ের সাক্ষী, যখন সিনেমা শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; একটি সিনেমা মুক্তি পাওয়া মানেই ছিল মানুষের মধ্যে উৎসবের আবহ। প্রেক্ষাগৃহের সামনে লাইন, পোস্টারে প্রিয় নায়ক-নায়িকার মুখ, সিনেমার গান মানুষের মুখে মুখে ফেরার সেই সময়ে চম্পাও ছিলেন দর্শকের ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দুতে।
তবে চম্পাকে শুধু জনপ্রিয়তার হিসাব দিয়ে বিচার করলে তাঁর শিল্পীসত্তার প্রতি অবিচার করা হবে। কারণ তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো পুরস্কারের সংখ্যায় নয়, বরং চরিত্রের বৈচিত্র্যে। তিনি একই সঙ্গে বাণিজ্যিক সিনেমার দর্শককে আনন্দ দিয়েছেন এবং শিল্পসম্মত সিনেমার দর্শক-সমালোচকের কাছ থেকেও সম্মান অর্জন করেছেন। এই দুই জগতের মধ্যে সফলভাবে চলতে পারা খুব সহজ নয়। কিন্তু চম্পা সেটিই পেরেছেন। তাঁর অভিনয় প্রমাণ করেছে, একজন অভিনেত্রীর সৌন্দর্য যেমন পর্দায় দর্শককে আকৃষ্ট করতে পারে, তেমনি তাঁর অভিনয়ের গভীরতা সেই দর্শককে দীর্ঘদিন মনে রাখতে বাধ্য করতে পারে।
আজ এত বছর পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে চম্পার নামটি আলাদা করেই উচ্চারণ করতে হয়। কারণ তিনি শুধু একটি সময়ের জনপ্রিয় নায়িকা ছিলেন না; তিনি ছিলেন সেই সময়ের চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুখ। তাঁর অভিনয়ে কখনো ছিল প্রেমের কোমলতা, কখনো ছিল জীবনের কঠিন বাস্তবতা, কখনো ছিল নারীর অসহায়ত্ব, আবার কখনো ছিল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়ার সাহস।
যশোরের সেই ছোট্ট মেয়েটি, যে মাত্র সাত বছর বয়সে মাকে হারিয়েছিল, যে বড় হয়েছে সংস্কৃতিমনা একটি পরিবারে, যে কৈশোরে শ্রীদেবীর অভিনয় অনুকরণ করত, যে ১৯৮১ সালে টেলিভিশনের পর্দায় প্রথম পা রেখেছিল—সেই মেয়েটিই একদিন হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম কিংবদন্তি অভিনেত্রী।
সময়ের স্রোত অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। বদলে গেছে সিনেমা তৈরির ধরন, বদলে গেছে দর্শকের রুচি, বদলে গেছে তারকাদের সংজ্ঞাও। কিন্তু কিছু নাম সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না। বরং সময় যত এগিয়ে যায়, তাঁদের কাজের মূল্য তত বেশি করে অনুভূত হয়।
চম্পা তেমনই একটি নাম।
তিনি এসেছিলেন অভিনয় করতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রেখে গেছেন একটি দীর্ঘ চলচ্চিত্র-উত্তরাধিকার। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো আজও বাংলা সিনেমার দর্শকের স্মৃতিতে বেঁচে আছে। বিশেষ করে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র মালা কিংবা ‘উত্তরের খেপ’-এর মতো চরিত্র মনে করিয়ে দেয়—চম্পা শুধু পর্দায় উপস্থিত ছিলেন না, তিনি চরিত্রকে নিজের মধ্যে ধারণ করতেন।
আর সেই কারণেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চম্পার নাম উচ্চারিত হলে শুধু একজন নায়িকার কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে এমন একজন শিল্পীর কথা, যিনি জনপ্রিয়তার পাশাপাশি অভিনয়ের গভীরতাকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
রুপালি পর্দায় অসংখ্য মুখ এসেছে, অনেকেই জনপ্রিয় হয়েছেন, অনেকেই সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছেন। কিন্তু কিছু শিল্পী তাঁদের অভিনয় দিয়ে সময়কে অতিক্রম করেন। দর্শকের স্মৃতিতে তাঁদের জন্য আলাদা একটি জায়গা তৈরি হয়। চম্পা সেই জায়গাটিই তৈরি করে নিয়েছেন নিজের অভিনয় দিয়ে।
তাই আজও যখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সোনালি দিনের গল্প বলা হয়, যখন নব্বইয়ের দশকের সিনেমার কথা উঠে আসে, যখন শক্তিশালী নারী চরিত্রের অভিনয়ের উদাহরণ খোঁজা হয়—তখন ফিরে আসতেই হয় সেই নামের কাছে…চম্পা।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
একজন জনপ্রিয় নায়িকা।
একজন শক্তিশালী অভিনেত্রী।
আর দর্শকের ভালোবাসায় আজও অমলিন—
ঢাকাই সিনেমার শ্রীদেবী, চম্পা।
আরও খবর
চিরসবুজ নায়ক জাফর ইকবাল
একটা সময় ছিল, যখন পর্দায় একজন নায়ক এলেই বদলে যেত পুরো পরিবেশ। গিটার হাতে, চোখে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস, চুলের স্টাইলে...
রুপালি পর্দায় পূর্ণিমার উত্থান | কিশোরী বয়সে সিনেমায়, তারপর তারকাখ্যাতি
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এমন কিছু মুখ আছে, যাদের দেখলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি সময়… মনে পড়ে যায় সেইসব সিনেমার গল্প,...
হুমায়ূন ফরীদি | মঞ্চ থেকে রুপালি পর্দা | ভিলেন থেকে কিংবদন্তি | একশিল্পীর হাজারো চরিত্র | Humayun Faridi.
বাংলা অভিনয় জগতে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের শুধু অভিনেতা বললে যেন তাদের প্রতি অবিচার করা হয়। কারণ তারা একটি...
ঢালিউডের বুনো সুন্দরী পপি
সাদিকা পারভিন পপি—বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আলোচিত ও জনপ্রিয় এক নাম। রূপ, গ্ল্যামার, অভিনয় আর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের নানা সাফল্য মিলিয়ে তিনি নব্বইয়ের...
ঢাকাই সিনেমার রাজা | নায়করাজ রাজ্জাক | প্রেম, সংগ্রাম, সাফল্য আর কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গল্প
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নাম শুধু অভিনেতার পরিচয় বহন করে না—তারা নিজেরাই হয়ে ওঠেন একটি যুগের নাম। যাদের পর্দায় উপস্থিতি...
মৌসুমী | নব্বইয়ের দশকের স্বপ্নের নায়িকা (ভিডিও)
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এমন কিছু নায়িকা আছেন, যাদের নাম উচ্চারণ করলেই ভেসে ওঠে একটি সোনালি সময়ের স্মৃতি। সেই তালিকার একেবারে...
