বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাদের চলে যাওয়ার পরও তাদের জনপ্রিয়তা এতটুকু কমে না। সময়ের সঙ্গে বদলে যায় চলচ্চিত্র, বদলে যায় দর্শকের রুচি, বদলে যায় অভিনয়ের ধরন—কিন্তু কিছু শিল্পীর অভিনয় থেকে যায় মানুষের স্মৃতিতে। তেমনই একজন কিংবদন্তি কৌতুক অভিনেতা দিলদার।

একসময় ঢাকাই সিনেমায় কৌতুক মানেই যেন ছিল দিলদার। তার মুখের অভিব্যক্তি, কথা বলার ধরন, শরীরী অভিনয় এবং হাস্যরসের স্বতন্ত্র উপস্থাপন দর্শকদের কাছে তাকে করে তুলেছিল অনন্য। নায়ক-নায়িকাদের পাশাপাশি শুধু একজন কৌতুক অভিনেতাকে দেখার জন্যও দর্শক সিনেমা হলে ভিড় করতেন। ভালোবাসা থেকে ভক্তরা তাকে বলতেন—‘ঢাকাই সিনেমার হাসির রাজা’।

দিলদারের জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৩ জানুয়ারি চাঁদপুর জেলার শাহতলী গ্রামে। তার পারিবারিক নাম ছিল দেলোয়ার হোসেন। একই নামে তার এক মামা থাকায় চলচ্চিত্রে আসার আগে নিজের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সবার সম্মতিতে নতুন নাম রাখা হয় দিলদার হোসেন। পরবর্তীকালে এই নামটিই হয়ে ওঠে বাংলা চলচ্চিত্রের কৌতুক অভিনয়ের এক উজ্জ্বল পরিচয়।

ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। এসএসসি পাস করার পর আর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা এগিয়ে নেননি। জীবনের পথ তাকে নিয়ে যায় চলচ্চিত্রের জগতে। চলচ্চিত্রে তার অভিষেক ঘটে ‘কেন এমন হয়’ সিনেমার মাধ্যমে। তার চলচ্চিত্রে প্রবেশের সাল নিয়ে বিভিন্ন প্রকাশিত লেখায় ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়; তবে এই সিনেমাটিকেই তার অভিনয়জীবনের সূচনাকর্ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

শুরুতে হয়তো কেউ ভাবেননি, এই মানুষটিই একদিন বাংলা চলচ্চিত্রের কৌতুক অভিনয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ হয়ে উঠবেন। কিন্তু নিজের স্বতন্ত্র অভিনয়শৈলী দিয়ে খুব দ্রুত দর্শকের নজর কাড়েন দিলদার। তার অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল—তিনি শুধু সংলাপ বলতেন না, পুরো শরীর, মুখের অভিব্যক্তি এবং অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলতেন।

আশি ও নব্বইয়ের দশকে ঢাকাই চলচ্চিত্রের ব্যবসায়িক সাফল্যের সঙ্গে দিলদারের নাম গভীরভাবে জড়িয়ে যায়। কোনো কোনো সিনেমায় তার জন্য আলাদাভাবে চরিত্র কিংবা গল্প তৈরি করা হতো। প্রযোজক ও নির্মাতাদের কাছে তার উপস্থিতি ছিল দর্শক আকর্ষণের অন্যতম উপাদান। সিনেমার পোস্টার ও প্রচারণাতেও নায়ক-নায়িকার পাশাপাশি আলাদা গুরুত্ব পেতেন তিনি।

দিলদারের জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, একসময় তাকে কেন্দ্র করেই সিনেমার গল্প নির্মাণ করা হয়। তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত ‘আবদুল্লাহ’ সিনেমায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অভিনয় করেন এবং নায়িকা ছিলেন নূতন। কৌতুক অভিনেতা হিসেবে পরিচিত হলেও এই ধরনের কাজ প্রমাণ করে, অভিনয়ের পরিধি শুধু হাসির চরিত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না তার।

তার অভিনীত চলচ্চিত্রের তালিকাও ছিল দীর্ঘ। **‘বেদের মেয়ে জোছনা’, ‘বিক্ষোভ’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘কন্যাদান’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘সুন্দর আলী জীবন সংসার’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘শান্ত কেন মাস্তান’, ‘গাড়িয়াল ভাই’, ‘অচিন দেশের রাজকুমার’, ‘প্রেম যমুনা’, ‘বাঁশিওয়ালা’, ‘তুমি শুধু আমার’, ‘খাইরুন সুন্দরী’, ‘গুণ্ডা নাম্বার ওয়ান’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘নাগ নাগিন’**সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।

দিলদারের জনপ্রিয়তার আরেকটি বিশেষ দিক ছিল—তিনি শুধু পুরোনো প্রজন্মের দর্শকদের কাছেই জনপ্রিয় ছিলেন না। তার অভিনীত দৃশ্য ও সংলাপ পরবর্তী সময়েও মানুষের মধ্যে নতুন করে জনপ্রিয় হয়েছে। আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে তার অভিনীত বিভিন্ন ছোট দৃশ্য, ভিডিও ও রিলস নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও পৌঁছে যায়। অনেক তরুণ দর্শকও তার অভিনয়ের স্বতন্ত্র ধরন দেখে মুগ্ধ হন।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন বলে বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ পাওয়া যায়। তার জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তাকে শুধু একজন কৌতুক অভিনেতা হিসেবে দেখলে তার অবদানকে ছোট করে দেখা হয়। তিনি ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের বিনোদনজগতের এমন এক মুখ, যার উপস্থিতি একটি দৃশ্যকে মুহূর্তেই প্রাণবন্ত করে তুলতে পারত।

অভিনয়ের স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। ২০০৩ সালে ‘তুমি শুধু আমার’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য সেরা কৌতুক অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এটি ছিল তার দীর্ঘ অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন এবং কৌতুক অভিনয় যে চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পরূপ—তারও একটি বড় স্বীকৃতি।

তবে জীবনের শেষ অধ্যায় খুব দীর্ঘ ছিল না। ২০০৩ সালের ১৩ জুলাই মাত্র ৫৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন দিলদার। ঢাকার ডেমরার সানারপাড় এলাকার পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

দিলদারের ব্যক্তিজীবনে ছিলেন স্ত্রী রোকেয়া বেগম এবং দুই কন্যা—মাসুমা আক্তার ও জিনিয়া আফরোজ। বড় মেয়ে মাসুমা আক্তার রুমা দন্তচিকিৎসক। ছোট মেয়ে জিনিয়া আফরোজ। পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে, চলচ্চিত্রের প্রতি দিলদারের গভীর ভালোবাসার কথা। শুটিংয়ের ব্যস্ততায় দিনের পর দিন পরিবার থেকে দূরে থাকতে হতো তাকে। সকালে সন্তানরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই তিনি কাজে বেরিয়ে যেতেন, আবার অনেক রাতে যখন পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে পড়ত, তখন ফিরতেন বাড়িতে।

তার জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়তো তার মৃত্যুর পরও তাকে ভুলতে না পারা। মৃত্যুর পর বছরের পর বছর কেটে গেছে, কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শক এখনও দিলদারের অভিনয় খোঁজেন। টেলিভিশনে তার পুরোনো সিনেমা প্রচার হলে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কোনো হাসির দৃশ্য ছড়িয়ে পড়লে দর্শক আবারও ফিরে যান সেই পুরোনো সময়ের কাছে।

একসময় যে মানুষটি পর্দায় দাঁড়িয়ে মানুষকে হাসিয়েছেন, আজ তিনি নিজে নেই। কিন্তু তার তৈরি করা হাসির মুহূর্তগুলো এখনও আছে। তার সংলাপ আছে, অভিনয়ের দৃশ্য আছে, আছে দর্শকের স্মৃতি। আর আছে এমন এক স্বতন্ত্র অভিনয়শৈলী, যা বাংলা চলচ্চিত্রের কৌতুক অভিনয়ের ইতিহাসে তাকে আলাদা জায়গা দিয়েছে।

দিলদার চলে যাওয়ার পর ঢাকাই সিনেমার কৌতুক অভিনয়ে তার মতো জনপ্রিয়তার জায়গা আর কেউ পূরণ করতে পেরেছেন কি না—এ নিয়ে দর্শকের মধ্যে নানা মত থাকতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত—দিলদার নামটি বাংলা চলচ্চিত্রের হাস্যরসের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, তাকে বাদ দিয়ে ঢাকাই সিনেমার কৌতুক অভিনয়ের ইতিহাস বলা কঠিন।

তিনি ছিলেন পর্দার হাসির মানুষ।
তিনি ছিলেন দর্শকের আনন্দের মানুষ।
আর সেই কারণেই প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মৃত্যুর পরও তিনি বেঁচে আছেন দর্শকের স্মৃতিতে।

দিলদার নেই, কিন্তু দিলদারের হাসি আছে।
দিলদার নেই, কিন্তু তার অভিনয় এখনও মানুষকে হাসায়।
আর তাই বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি আজও—‘হাসির রাজা দিলদার’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post সুরের পদ্মাবতী সাবিনা ইয়াসমীন
Close

ঢাকাই সিনেমার হাসির রাজা দিলদার

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাদের চলে যাওয়ার পরও তাদের জনপ্রিয়তা এতটুকু কমে না। সময়ের সঙ্গে বদলে যায় চলচ্চিত্র, বদলে যায় দর্শকের রুচি,...

ঢাকাই সিনেমার শ্রীদেবী, চম্পা

https://www.youtube.com/watch?v=8QBasJKBpuI বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আকাশে এমন কিছু তারকা আছেন, যাঁদের নাম উচ্চারণ করলেই একটি সময়, একটি প্রজন্ম আর অসংখ্য সিনেমার স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তাঁদের...

চিরসবুজ নায়ক জাফর ইকবাল

একটা সময় ছিল, যখন পর্দায় একজন নায়ক এলেই বদলে যেত পুরো পরিবেশ। গিটার হাতে, চোখে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস, চুলের স্টাইলে আধুনিকতার ছোঁয়া, আর মুখে এমন...

রুপালি পর্দায় পূর্ণিমার উত্থান | কিশোরী বয়সে সিনেমায়, তারপর তারকাখ্যাতি

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এমন কিছু মুখ আছে, যাদের দেখলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি সময়… মনে পড়ে যায় সেইসব সিনেমার গল্প, গান আর প্রেক্ষাগৃহভরা দর্শকের উচ্ছ্বাস।...

হুমায়ূন ফরীদি | মঞ্চ থেকে রুপালি পর্দা | ভিলেন থেকে কিংবদন্তি | একশিল্পীর হাজারো চরিত্র | Humayun Faridi.

বাংলা অভিনয় জগতে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের শুধু অভিনেতা বললে যেন তাদের প্রতি অবিচার করা হয়। কারণ তারা একটি চরিত্রে অভিনয় করেন না, বরং...