মরান হাশমি ও ইয়ামি গৌতম অভিনীত কোর্টরুম ড্রামা ‘হক’ প্রেক্ষাগৃহে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। গত বছরের ৭ নভেম্বর মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি সমালোচকদের কাছ থেকে প্রশংসা পেলেও সাধারণ দর্শকদের বড় অংশকে হলে টানতে ব্যর্থ হয়। ফলে বক্স অফিসের হিসাব শেষ পর্যন্ত নির্মাতাদের পক্ষে যায়নি।

ভারতীয় গণমাধ্যম ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের তথ্যমতে, ‘হক’ নির্মাণে মোট বাজেট ছিল আনুমানিক ৪০ থেকে ৪৫ কোটি রুপি। এতে প্রোডাকশন ব্যয়ের পাশাপাশি শিল্পী পারিশ্রমিক ও প্রচারণা খরচ অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর সিনেমাটির আয় সেই বাজেটের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি।

বক্স অফিস হিসাব অনুযায়ী, ভারতে সিনেমাটির লাইফটাইম নেট আয় ছিল প্রায় ১৯ থেকে ২০ কোটি রুপি। আন্তর্জাতিক বাজারসহ মোট আয় দাঁড়ায় আনুমানিক ২৮ থেকে ৩০ কোটি রুপি। এই হিসাবে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি থেকে ‘হক’ নিজের বাজেট পুরোপুরি তুলতে পারেনি। বরং থিয়েট্রিক্যাল রান শেষে সিনেমাটি ১০ থেকে ১৫ কোটি রুপি ঘাটতিতে পড়ে বলে ধারণা করা হয়। সে কারণেই বাণিজ্য বিশ্লেষকদের চোখে এটি প্রেক্ষাগৃহে বাণিজ্যিকভাবে ব্যর্থ তালিকায় পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক ও আইনি প্রেক্ষাপটে নির্মিত কোর্টরুম ড্রামা সাধারণত বড় দর্শক টানতে পারে না। পাশাপাশি মুক্তির সময় বাণিজ্যিক ঘরানার অন্যান্য সিনেমার সঙ্গে প্রতিযোগিতাও বক্স অফিসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

তবে প্রেক্ষাগৃহে সেই ব্যর্থতাকে মাথায় রেখেই ২ জানুয়ারি সিনেমাটি নেটফ্লিক্সে মুক্তি দেওয়া হয়। আর সেখানেই পাল্টে যায় ছবিটির ভাগ্য। নেটফ্লিক্সের উইকলি রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে ‘হক’। অ-ইংরেজি ভাষার সিনেমা হিসেবে গ্লোবাল চার্টে এটি দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। বিশ্বের পাঁচটি দেশে এক নম্বরে রয়েছে সিনেমাটি এবং ১৪টি দেশে জায়গা করে নিয়েছে শীর্ষ দশে।

বাংলাদেশেও দর্শকদের মন জয় করেছে ‘হক’। চলতি সপ্তাহে নেটফ্লিক্সে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি দেখা সিনেমার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে এটি। সব মিলিয়ে, হিন্দি ভাষার এই কোর্টরুম ড্রামা আন্তর্জাতিক পরিসরেও প্রভাব বিস্তার করেছে।

‘হক’ নির্মিত হয়েছে বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে লেখা বই ‘বানু: ভারত কি বেটি’ থেকে। গল্পের প্রেক্ষাপট ১৯৬৭ সালের ভারতের উত্তর প্রদেশ। আইনজীবী আব্বাস খানের সঙ্গে বিয়ে হয় সাজিয়া বানুর। শুরুতে সংসার ভালোই চলছিল, তাদের ঘরে আসে দুই সন্তান। একসময় কাজে মাসখানেকের জন্য বাইরে গিয়ে ফিরে এসে নতুন বউ নিয়ে হাজির হন আব্বাস। সেখান থেকেই সাজিয়া বানুর জীবনের লড়াই শুরু।

সন্তানদের ভরণপোষণের দাবিতে আদালতের দ্বারস্থ হলেও সাজিয়াকে পাঠানো হয় মুসলিম পারিবারিক আদালতে, যেখানে তিনি প্রত্যাখ্যানের শিকার হন। একপর্যায়ে তালাক দেওয়া হলেও হাল ছাড়েন না তিনি। প্রায় এক দশকের আইনি লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে নিজের অধিকার ফিরে পান সাজিয়া। ভারতে এই রায় ছিল এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

সিনেমাটি নিয়ে ইয়ামি গৌতম বলেন, ‘এই গল্প আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এটি শুধু সাজিয়ার লড়াই নয়, অসংখ্য নারীর শক্তি, সহনশীলতা ও ন্যায়বোধের প্রতিফলন।’

ইমরান হাশমি বলেন, ‘এখনো আমরা একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বসবাস করি। নারীর মর্যাদা নানা ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হয়। হক সিনেমায় আমরা যতটা সম্ভব সংবেদনশীলভাবে বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।’

ওটিটিতে সিনেমাটির সাফল্যে আপ্লুত নির্মাতা সুপর্ণ ভার্মা। তিনি বলেন, ‘আমি কখনো এমন সিনেমা বানাতে চাইনি, যা শুধু ট্রেন্ডিং হবে। বরং এমন কাজ করতে চেয়েছি, যা টিকে থাকবে। হক নিয়ে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে—সৎভাবে বলা গল্প শেষ পর্যন্ত মানুষের মন জয় করেই।’

সব মিলিয়ে, প্রেক্ষাগৃহে বাজেট ও আয়ের হিসাবে ‘হক’ প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও ওটিটিতে এসে সিনেমাটি নতুন জীবন পেয়েছে—যা আবারও প্রমাণ করে, সময় ও মাধ্যম বদলালেও গল্পের শক্তিই শেষ কথা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post গোল্ডেন গ্লোবে কার হাতে কোন পুরস্কার উঠল
Next post যৌনপল্লি উচ্ছেদের গল্পে ‘রঙবাজার’
Close

মিনা পাল থেকে রূপালি পর্দার কিংবদন্তি কবরী

তেরো বছর বয়সী এক কিশোরী। চোখে তখন বড় হওয়ার স্বপ্ন, মনে অভিনয়ের আকাঙ্ক্ষা। চট্টগ্রামের একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা সেই মেয়েটি হয়তো তখনও জানতেন...

ঢাকাই সিনেমার হাসির রাজা দিলদার

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাদের চলে যাওয়ার পরও তাদের জনপ্রিয়তা এতটুকু কমে না। সময়ের সঙ্গে বদলে যায় চলচ্চিত্র, বদলে যায় দর্শকের রুচি,...

ঢাকাই সিনেমার শ্রীদেবী, চম্পা

https://www.youtube.com/watch?v=8QBasJKBpuI বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আকাশে এমন কিছু তারকা আছেন, যাঁদের নাম উচ্চারণ করলেই একটি সময়, একটি প্রজন্ম আর অসংখ্য সিনেমার স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তাঁদের...

চিরসবুজ নায়ক জাফর ইকবাল

একটা সময় ছিল, যখন পর্দায় একজন নায়ক এলেই বদলে যেত পুরো পরিবেশ। গিটার হাতে, চোখে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস, চুলের স্টাইলে আধুনিকতার ছোঁয়া, আর মুখে এমন...

রুপালি পর্দায় পূর্ণিমার উত্থান | কিশোরী বয়সে সিনেমায়, তারপর তারকাখ্যাতি

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এমন কিছু মুখ আছে, যাদের দেখলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি সময়… মনে পড়ে যায় সেইসব সিনেমার গল্প, গান আর প্রেক্ষাগৃহভরা দর্শকের উচ্ছ্বাস।...