কলকাতার হাওড়া ব্রিজ ভ্রমণ

Spread the love

কলকাতায় ব্রিটিশ স্থাপত্য কর্মের শক্তিশালী অনুস্মারক বা স্মৃতিচিহ্নগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে হুগলী নদীর প্রস্থ জুড়ে প্রসারিত হাওড়া ব্রিজ। ইস্পাতের এই দৈত্যকার প্রসারণ দুটি যমজ শহর- হাওড়া ও কলকাতাকে সংযুক্ত করেছে। একজন ভ্রমণার্থী, যদি কলকাতা ভ্রমণের মাধ্যমে শহরটিকে অনুসন্ধানের পরিকল্পনা করেন তবে তাকে হাওড়া ব্রীজটি অতিক্রম করতেই হবে। আর তিনি যখন এটি অতিক্রম করবেন তখন অবশ্যম্ভাবীরূপে কিছুক্ষণের জন্য হলেও বিহ্বল হয়ে পড়বেন।

তবে, কলকাতা নিউ ইয়র্ক নয়, আর এখানে আপনি আপনার ব্যস্ততাহীন ব্রুকলিন ব্রীজে স্বস্তিতে ছবি তোলার কথা আশা করতে পারবেন না। আপনি ৭০৫ মিটার দীর্ঘ ব্রীজটি হেঁটে চলার পরিকল্পনা করলে, বিশ্বের এই ব্যস্ততম সেতুটির উপর দিয়ে আপনার চলার পথে আপনি এত ব্যস্ত হয়ে পড়বেন, যে এখানে থামার জন্য ও দেখার জন্য কেবল কয়েকটি মুহুর্তই পাবেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বর্মিদের সম্মুখে মিত্র বাহিনীকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার জন্য বিট্রিশদের দ্বারা এই সেতুটি নির্মিত হয়েছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায়, হাওড়া ব্রিজ ঊনবিংশ শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল। ব্রিজটি দীর্ঘ সাত বছর ধরে কাজ চলার পর ১৯৪২ সালে সম্পূর্ণ হয় এবং ১৯৪৩ সালে এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হয়।

ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত সেতুগুলির মধ্যে হাওড়া ব্রিজ অন্যতম। এটি সেই সময়ের একটি স্থাপত্যের বিস্ময়। নির্মাণের সময়ে, এই সেতুটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম খিলানের উপর স্থাপিত সেতু ছিল। কখনও কেউ কলকাতায় ভ্রমণে গেলে, অবশ্যই হাওড়া ব্রিজ পরিদর্শনের একটি সফর নিশ্চিত করবেন। দেখে বিস্ময় বোধ করবেন এই জন্য যে ‘কোনও রকম নাট ও বোল্ট ছাড়াই’ ৮২ মিটার উচ্চতার সঙ্গে ৭০৫ মিটার দীর্ঘ সেতুটি, দৈনিক ১ লাখ ৫০ হাজার যানবাহন ও ৪০ লাখ পথচারীদের ওজন বহন করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হাওড়া ব্রিজ হল একটি নিলম্বিত ধরনের সুষম খিলানের উপর স্থাপিত সেতু। এটির ১৫শ’ ফুট কেন্দ্রীয় ব্যাপ্তি রয়েছে। এটির নিলম্বিত বা ঝুলন্ত ব্যাপ্তি বা স্প্যান হল ৫৬৪ ফুট।

যে কোনও স্থাপত্যের কৃতিত্ব তার নকশা এবং শক্তির উপর বিচার করা হয়। এই উভয় ক্ষেত্রেই হাওড়া ব্রিজ উচ্চ আসনে। সেতুটি ট্রাফিক, যানবাহন, পথচারী এবং গবাদি পশুর এক বিশাল প্রবাহকে সামাল দেয়। পাকা রাস্তার দু’ধারে, উভয়দিকে ১৫ ফুট বিস্তৃত ফুটপাত রয়েছে, যেগুলি পথচারীদের ভিড়ে পূর্ণ থাকে। ১৯৯৩ সালের আগে পর্যন্ত, এই সেতুর উপর দিয়ে ট্রামও চলাচল করত।

সেতুটির একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসাবে সিসিটিভি. ক্যামেরা স্থাপণ করা হয়েছে।

হাওড়া ব্রিজটি, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামানুসারে রবীন্দ্র সেতু নামকরণ করা হয়। তবে, প্রাত্যাহিক বাক্যালাপে সেতুটি হাওড়া ব্রিজ নামেই উল্লেখ হয়ে আসছে।

আপনি চাইলে রাতে সেতুটি ভ্রমণ করতে পারেন। কারণ দিনের বেলায় আপনি কিছুক্ষণের জন্য অপেক্ষা ও দাঁড়াবার মতো সময় পাবেন না। রাত্রিবেলার আলোকিত দৃশ্য নিশ্চয়ই আপনাকে মুগ্ধ করবে। দিনের গোলমালের বিনিময়ে রাতের নীরব আলোকিত হুগলী ভিন্ন এক আনন্দ দেবে। হাওড়া ব্রিজের একটি সন্ধ্যা ভ্রমণার্থীদের কাছে একটি মিলনস্থান স্বরূপ। এটি যেদিন দেখবেন সেদিন আপনি এই শহরটিকে আপনার নিজের শহর বলে দাবি করার সিদ্ধান্ত নেবেন।

হাওড়া ব্রিজ সম্পর্কে তথ্যাবলী
হাওড়া ব্রিজটি একটি আট-লেন যুক্ত সেতু। যেখানে বিপূল ট্রাফিক দেখা যায়।
এই সেতুটির নির্মাণে এক অবিশ্বাস্য পরিমাণ- ২৬ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন্ ইস্পাত ব্যবহৃত হয়েছিল।
টাটা স্টিল, সেতুটির নির্মাণে প্রয়োজনীয় ইস্পাতের এক অন্যতম সরবরাহকারী ছিল।
প্রখর গ্রীষ্মের সময়, সমগ্র সেতুটি এক মিটারের মতন দৈর্ঘ্যে প্রসারিত হয়।
সেতুটির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন, এমতাবস্থায় ছবি তোলার উপর বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে, দূর থেকে আপনি যত ইচ্ছে ছবি তুলতে পারেন। নদীতীর থেকে এই দৃশ্য বিশেষভাবে ভালো দেখায়। কিন্তু যদি আপনি স্থাপত্য সম্পর্কে বাস্তবিক প্রখর দৃষ্টান্ত দেখতে চান তবে, একটি ভাল ধারণা হল ছবি তোলা ভুলে, প্রকৃতভাবে এই বিস্ময়টি সম্পর্কে কাছ থেকে লক্ষ্য করুন।
এটি বিশ্বের ষষ্ঠ দীর্ঘতম খিলান সেতু।

সেতুটি হাওড়া, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত।

হাওড়া ব্রিজ পৌঁছানোর উপায়
বিমান মাধ্যমে
নিকটবর্তী বিমানবন্দর হল কলকাতায় অবস্থিত নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। একটি গাড়ী যশোর রোড হয়ে আধ ঘন্টায় হাওড়া ব্রিজ রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে দেবে।

রেল মাধ্যমে
আপনি যদি হাওড়া রেলওয়ে স্টেশনে নামেন, বঙ্কিম সেতু দিয়ে হাঁটতে থাকুন এবং ১৫ মিনিটের মধ্যে আপনি এখানে পৌঁছে যাবেন। গাড়ির মাধ্যমে গেলে সেখানে পৌঁছাতে আরোও কম সময় লাগে।

আপনি যদি শিয়ালদহ রেলওয়ে স্টেশন থেকে হাওড়া ব্রিজে পৌঁছাতে চান, তাহলে গাড়ির মাধ্যমে ভায়া মহাত্মা গান্ধী রোড হয়ে এখানে পৌঁছাতে আপনার প্রায় ১০ মিনিট সময় লাগবে।

হাওড়া ব্রিজ পরিদর্শনের সেরা সময়
কলকাতা ও তার সমগ্র আকর্ষণীয় স্থানগুলি শরৎকাল ও শীতকালে অক্টোবর থেকে মার্চ মাসের মধ্যে ভ্রমণ করুন। মার্চের পর, তাপমাত্রার প্রখরতা বাড়তে থাকে এবং জুলাই-আগস্ট নাগাদ প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং সড়কগুলো জলে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে; তাই এইসময় ভ্রমণ কম উপভোগ্য হয়।

হাওড়া ব্রিজ দর্শনের সময়
হাওড়া ব্রিজ, সারাদিন ধরে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। তবে, সেতুটিতে একটি দীর্ঘ নির্বিঘ্ন সফরের জন্য, হয় গভীর রাতে না হয় খুব সকালে পরিদর্শন করার চেষ্টা করুন। কলকাতা ভোরবেলায় একটি ভিন্ন সৌন্দর্য ধারণ করে। এই সময়ে হাওড়া ব্রিজ পরিদর্শন একটি মহান অভিজ্ঞতা হতে পারে।

হাওড়া ব্রিজ টিকিট
সেতুটির সমগ্র পরিসরে প্রবেশের জন্য দর্শকদের কোনও প্রবেশমূল্য লাগে না।

নিকটবর্তী আকর্ষণ
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল।
শহীদ মিনার, কলকাতা।
সায়েন্স সিটি, কলকাতা।
অথিরাপিল্লি ফলস্।
নিক্কো পার্ক।
বিড়লা তারামন্ডল, ইত্যাদি।