ভালোবাসার নির্দেশন প্যারিসের পন্ট ডেস আর্টস ব্রিজ

Spread the love

আপনার কি মনে হয় ভালোবাসাকে কোনো তালা-চাবি দিয়ে ধরে রাখা যায়? সত্যিই কি এটা সম্ভব? কিন্তু এমনটাই হয়েছে। চলুন জেনে নেয়া যাক ভালোবাসার অন্যতম নির্দেশন প্যারিসের পন্ট ডেস আর্টস ব্রিজ সর্ম্পকে।

রোমান্টিক মানুষদের কাছে প্যারিসের বিকল্প কোনো শহর বোধহয় এই পৃথিবীতে নেই। প্যারিসে ভালোবাসা সম্পর্কিত এমন কিছু ব্যাপার আছে যা এই শহরকে অন্য সব শহর থেকে আলাদা করেছে। এ শহরটি ভালোবাসাকে এমনভাবে লালন করছে যেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ভালোবাসার ধ্বংস হবে না। প্যারিসের পন্ট ডেস আর্টস ব্রিজ ভালোবাসা এবং রোমান্সের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য দিয়ে প্রেমিকদের মন জুড়ে বিরাজ করছে। এখানে প্রেমিক-প্রেমিকারা তাদের ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ তালা ঝুলিয়ে যায়। আর সেই তালার চাবিটা ফেলে দেয় শ্যেন নদীতে। ভালোবাসায় তালা মেরে চাবিটা ছুড়ে ফেলুন শ্যেন নদীতে। আর ভাঙবে না প্রেম! আলাদা হবে না প্রেমের জুটি! এমন সরলপ্রাণ বিশ্বাসেই প্যারিসের সেতুগুলোতে ‘লাভ লকস’ বা ‘ভালোবাসার তালা’ ঝুলিয়ে দিয়েছে আসছে অসংখ্য মানুষ।

প্রথমে আপনার অবশ্যই গার্লফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ড থাকতে হবে। সুন্দর একটি তালায় নিজেদের নাম লিখে একসঙ্গে সেতুর পাশে দাড়িয়ে তালাটি ঝুলিয়ে দিতে হবে। তারপরে চাবিটি সেতুর নিচে প্রবাহিত নদীতে ফেলে দিতে হবে। চাবিটি নদীতে ফেলে দেয়ার ফলে এটি খুঁজে পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। এজন্য প্রেমিকরা মনে করে তাদের প্রেম অমরত্ব লাভ করেছে।

যারা এই কথাগুলো শুনে অবাক হচ্ছেন তাদের একবার ইউরোপ ভ্রমণ করা উচিত। এই প্রেমের গল্পটি ইউরোপের প্রায় সব দেশেই ছড়িয়ে পড়ে। এটি প্যারিসের প্রথম ধাতব ব্রিজ। ফরাসির প্রথম সম্রাটের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছিল।

অনেকেই মনে করতে পারেন যে এই লাভ-লক রীতিটির উৎপত্তি প্যারিস থেকেই শুরু। মজার ব্যাপার হলো রীতিটি সার্বিয়ার ভ্রঞ্জাক্কা বানজা নামে একটি শহরে শুরু হয়েছিল। সেখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে এক যুবক ও যুবতী প্রেমে পড়েছিলেন। তারা ওই শহরের লুজুবাভি ব্রিজের ওপর প্রায় প্রতি রাতেই মিলিত হতো। কিন্তু যুবকটি সামরিক বাহিনীতে যোগদানের পর অন্য কারো প্রেমে পড়ে যায়। এই ঘটনা যুবতী সহ্য করতে না পেরে হৃদরোগে মারা যায়। এরপর থেকেই ওই স্থানে এক গুজব ছড়িয়ে পরে যে, যুবকটির আত্মা ব্রিজটির কাছে কান্না করছে। তাই তালায় তাদের ভালবাসার নাম লিখে ব্রিজের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। যেন তাদের ভালোবাসা পূর্ণতার রূপ পায়।

এছাড়াও ধারণা করা হয় প্রেমের লক ব্রিজের বর্তমান তরঙ্গের উৎস ফেডেরিকো মক্সিয়া নামে একক ইতালিয়ান লেখকের কাছ থেকে এসেছে।

চিন্তার কথা হচ্ছে- বিষয়টি এতোটা জনপ্রিয় হয়েছে যে ব্রিজে তালার সংখ্যা দিন দিন বেড়ে গিয়ে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এর ফলে পন্ট ডেস আর্টস ব্রিজটির বেড়ার এক অংশ ধসে যায়। দুর্বল চেইন লিঙ্কের বেড়াটি বেশি ভার নিতে না পারার কারণে এমনটি হয়ে থাকে। ফরাসি কর্মকতারা ব্রিজের উপর এ তালা না লাগানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তারা সফল হতে পারেনি। পরবর্তীতে তারা বিস্ময়করভাবে ৪৫ টন ওজনের তালাগুলো নামিয়ে ফেলেন। এ ঘটনার পর প্যারিস সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এর পরিবর্তে প্রেমের ভাস্কর্য ব্রিজ তৈরি করবে। কিন্তু তাদের সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়িত হওয়ার আগে প্যারিসে আরো ১১টি ব্রিজে প্রেমের এ তালাগুলো ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে প্রেমের তালাগুলো নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিন ব্রিজ (শহর কর্মকর্তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে), কোলনের হোহেনজোলারেন ব্রিজ ও জাপানের এনোশিমা দ্বীপে এ লাভ-লক গুলো বেশি দেখা যায়। আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনের হা পেনি সেতুটিও এই ভালোবাসার তালা বা ‘লাভ লক’ ঝোলানোর জন্য বিখ্যাত। ২০১২ সালে ডাবলিনের সিটি কাউন্সিল সেতুতে ভালোবাসার তালা ঝোলানো নিষিদ্ধ করে এবং শহরের যে কোনো সেতুতে এমন তালা দেখা গেলেই তা সরিয়ে ফেলার ঘোষণা দেয়। তবে, জনগণের তোপের মুখে কোলনের সেতুতে ‘লাভ লক’ নিষিদ্ধের চেষ্টা থেকে বিরত হয় নগর কর্তৃপক্ষ।

আপনি যদি প্যারিস ভ্রমণ করেন তবে প্রিয়জনকে নিয়ে অবশ্যই ঘুরে আসুন এই লাভ লক ব্রিজ থেকে।